ইসরায়েলে সরকার গঠন হবে কীভাবে, এগিয়ে কোন জোট
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে জোট করতে হয়। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠন করতে হলে কোনো জোটকে অন্তত ৬১টি আসন পেতে হবে। ফলে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলই যে সরকার গঠন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সরকার গঠনের প্রক্রিয়া যেভাবে
নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ হলে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপর যাঁর সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন, তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন।
দায়িত্ব পাওয়া নেতা জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পান। প্রয়োজন হলে তিনি আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানোর আবেদন করতে পারেন।
এই সময়ের মধ্যে জোট গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো নেতাকে সরকার গঠনের সুযোগ দিতে পারেন। দ্বিতীয় নেতাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সদস্যরা প্রেসিডেন্টকে তৃতীয় কোনো নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ করতে পারেন। এরপরও কেউ সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাবে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বারবার জোট গঠনে ব্যর্থতার কারণে ওই সময়ে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়।
২০২২ সালের নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ৩২টি পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে কয়েকটি কট্টর ডানপন্থী দলের সঙ্গে জোট গঠন করে নেতানিয়াহুর জোটের আসনসংখ্যা ৬৪-তে দাঁড়ায়। এর মধ্য দিয়ে তারা পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
বর্তমানে এগিয়ে কোন জোট
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্ধেকের বেশি ভোট গণনা শেষে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গাডি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যাচ্ছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান নিউজ, চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট ৫৫টি আসন পেতে পারে। কিছু প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৫৭ বলা হয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকোটের জোট ৪৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এসব হিসাব এখনো চূড়ান্ত নয়। ভোট গণনা শেষ হলে আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সময় ভোটদানের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের পর ওই সময় পর্যন্ত এটিই ছিল সর্বোচ্চ ভোটদানের হার।
সরকার গঠনে ‘কিংমেকার’ হতে পারে আরব দলগুলো
প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছেন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দল লিকুদ একক বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে। অতি-জাতীয়তাবাদী ও অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোকে নিয়ে গঠিত তাঁর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, প্রাথমিক ফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কারণ, শুরুতে যেসব এলাকার ভোট গণনা হয়েছে, সেগুলোর অনেক জায়গায় ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন বেশি। ফলে পরবর্তী সময়ে ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে।
ইসরায়েলের বিভক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাডি আইজেনকোটের পক্ষে আরব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে।
আংশিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, আরব দলগুলো আগের সর্বোচ্চ আসনসংখ্যার রেকর্ড ছুঁয়েছে অথবা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে এসব দলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় ইসরায়েলের অধিকাংশ ইহুদি বিরোধী দল জানিয়েছিল, তারা আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ দলগুলোর সঙ্গে কাজ করবে না। তাদের যুক্তি, এসব দলের সঙ্গে তাদের মূল্যবোধের মিল নেই। তবে অন্য দলগুলো রাজি হলে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, তাদের সমর্থনের ওপরই সরকার গঠনের হিসাব নির্ভর করতে পারে।
এবারের নির্বাচনে ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা আগের তুলনায় বেশি সংখ্যায় ভোট দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাঁদের অনেকে নিজেদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন।
অনেকের মতে, এবারের নির্বাচন ইসরায়েলের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এর মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ডানপন্থী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ওই সরকারের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।



