হরমুজে ‘নতুন শক্তি’ গড়ে তুলতে চায় ইরান

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ৫:১১ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২৬

পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির তলদেশে থাকা সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবলকে নতুন ধরনের কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ইরান। এ কেবলগুলোর মাধ্যমে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ ইন্টারনেট ও আর্থিক তথ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের রাষ্ট্রসমর্থিত ও সামরিক ঘনিষ্ঠ মহল থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দেশটি হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন কেবল ব্যবহারের জন্য বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ফি আদায়ের পরিকল্পনা করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান চাইছে গুগল, মাইক্রোসফট, মেটা ও অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের আইন মেনে চলুক এবং কেবল ব্যবহারের জন্য লাইসেন্স ফি প্রদান করুক। অন্যথায় কেবল কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, “আমরা ইন্টারনেট কেবলের ওপর ফি আরোপ করব।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ট্রাফিক সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ইন্টারনেট সেবাই নয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ, ক্লাউড কম্পিউটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

তারা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে ডিজিটাল বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর কাছে ডুবুরি, ক্ষুদ্র সাবমেরিন ও পানির নিচে পরিচালিত ড্রোন রয়েছে, যা সাবমেরিন কেবল লক্ষ্যবস্তু করার সক্ষমতা রাখে। যদিও ইরান সরাসরি কেবল ধ্বংসের ঘোষণা দেয়নি, তবে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত বারবার দেওয়া হচ্ছে।

তবে টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ভেতর দিয়ে যাওয়া কেবলগুলো বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ১ শতাংশেরও কম বহন করে। ফলে বৈশ্বিক প্রভাব সীমিত হলেও আঞ্চলিক ক্ষতি বড় হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাবমেরিন কেবলকে লক্ষ্য করে হামলা নতুন বিষয় নয়। উনিশ শতকের টেলিগ্রাফ যুগ থেকেও এমন কৌশলের ব্যবহার দেখা গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সংঘাত ও নৌযান দুর্ঘটনায় বিভিন্ন অঞ্চলে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

২০২৪ সালে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনায় লোহিত সাগরে তিনটি সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক ব্যাহত হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনের আওতায় নতুন কেবল স্থাপনের ক্ষেত্রে উপকূলীয় রাষ্ট্র কিছু শর্ত আরোপ করতে পারে। তবে বিদ্যমান চুক্তিতে একতরফা পরিবর্তন জটিল আইনি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান এখন বুঝতে শুরু করেছে যে হরমুজ প্রণালি শুধু জ্বালানি বাণিজ্যের নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তেহরান ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ মোকাবিলায় নিজেদের কৌশলগত শক্তি বাড়াতে চাইছে।