যে কৌশলে চতুর্থবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন লুলা

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ১২:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফায় প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন ৮০ বছর বয়সী বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। কিন্তু তিন সপ্তাহের প্রচারণায় ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় দফার ভোটে জয় পেয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন লুলা। দেশটির আধুনিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় জয়ের নজির গড়লেন তিনি।

২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে লুলা পেয়েছেন প্রায় ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। প্রথম দফায় ফ্লাভিও ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং লুলা ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। ফলে প্রথম দফার প্রায় ২২ লাখ ভোটের ব্যবধান পেরিয়ে লুলার এই জয়কে বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক কর্মসূচি ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি, গণতন্ত্রের পক্ষে সমর্থন জোরদার এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের বার্তা—সব মিলিয়ে লুলার জয়ের পথ তৈরি হয়েছে।

ভোটারদের কাছে নতুন করে পৌঁছানো

প্রথম দফার নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার ভোট দেননি। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে দ্বিতীয় দফার আগে লুলা ও তাঁর দল ভোটারদের কাছে নতুন করে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে যাঁরা প্রথম দফায় ভোট দেননি, তাঁদের পাশাপাশি সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।

প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর লুলা প্রচারণার কৌশল নতুন করে সাজান। তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছানো, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার আহ্বান এবং তাঁর সরকারের সামাজিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ তুলে ধরা ছিল এই প্রচেষ্টার অংশ।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক কর্মসূচি

নির্বাচনের আগে ব্রাজিলের মানুষের অন্যতম উদ্বেগ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়। খাদ্যপণ্যের দাম, পারিবারিক আর্থিক চাপ ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

লুলা তাঁর সরকারের সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি ধরে রাখা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে সামনে আনেন। অন্যদিকে ফ্লাভিও বলসোনারো অপরাধ দমন ও খাদ্যপণ্যের দাম কমানোর ওপর জোর দেন। ফলে নির্বাচনে অর্থনৈতিক স্বস্তি ও জননিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

জাতীয় সার্বভৌমত্বের বার্তা

প্রচারণায় জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এবং ব্রাজিলের ওপর আমেরিকার প্রভাব নিয়ে বিতর্কের মধ্যে লুলা দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের কথা বলেন।

বিজয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্যেও তিনি ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার এই বার্তা তাঁর প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমর্থন

ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে লুলার শক্তিশালী সমর্থনভিত্তি হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় দফার ভোট গণনার সময় এই অঞ্চলের ফলাফল আসার সঙ্গে সঙ্গে লুলা এগিয়ে যেতে শুরু করেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পরও এই অঞ্চলের সমর্থন ধরে রাখা এবং অন্যান্য এলাকার ভোটারদের কাছে পৌঁছানো তাঁর জয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে শুধু একটি অঞ্চল নয়, সামগ্রিক ভোটের ব্যবধানই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করেছে।

সামনে কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ঐতিহাসিক জয় পেলেও লুলার সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ দমন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক বিভাজনের মতো বিষয়গুলো তাঁর নতুন মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এ ছাড়া কংগ্রেসে রক্ষণশীল ও ডানপন্থী শক্তির প্রভাব থাকায় সরকারের নীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন হবে। নির্বাচনের ফল নিয়ে ফ্লাভিও বলসোনারো প্রশ্ন তুলেছেন এবং ফল বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। যদিও ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ জানায়নি। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ ও নির্বাচনী ফল নিয়ে বিতর্কও লুলার নতুন মেয়াদের শুরুতে চাপ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর ভোটারদের কাছে নতুন করে পৌঁছানো, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামাজিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন সামনে আনার মাধ্যমে লুলা গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন ধরে রাখতে পেরেছেন। তাঁর এই জয় শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বিভক্ত ব্রাজিলের রাজনীতিতে আগামী দিনের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে।