অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা আপিলে জট, বিচারাধীন ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মামলা
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিল করে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় রয়েছেন বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের হাজারো নাগরিক। শিক্ষার্থী, অভিবাসন ও সুরক্ষা ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন বাড়তে থাকায় দেশটির প্রশাসনিক পর্যালোচনা ট্রাইব্যুনালে (এআরটি) মামলার জট ক্রমেই বাড়ছে।
নতুন আবেদনের তুলনায় মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা কম হওয়ায় অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিল দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) প্রকাশিত অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনালের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে সব ধরনের মিলিয়ে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৪৯টি মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে ট্রাইব্যুনালে নতুন করে ৮৬ হাজার ৯৮০টি আবেদন জমা পড়ে। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ৬৫ হাজার ৯০০টি আবেদন। অর্থাৎ, নতুন আবেদনের তুলনায় প্রায় ২১ হাজার কম আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে আগের মামলার সঙ্গে নতুন আবেদন যুক্ত হয়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে।
শিক্ষার্থী ভিসার আপিল বেড়েছে ৪২ শতাংশ
ট্রাইব্যুনালে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে শিক্ষার্থী ভিসার আপিল। এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের আবেদন বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমানে শিক্ষার্থী ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন প্রায় ১৪ গুণ বেশি।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটিতে পড়তে যেতে চাওয়া অনেক শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁরা সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। কিন্তু আপিলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সিদ্ধান্তের জন্য তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের আপিলগুলোর অর্ধেক নিষ্পত্তি করতে আবেদন জমার দিন থেকে সর্বোচ্চ এক বছর পাঁচ মাস সময় লেগেছে। আর ৯৫ শতাংশ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে দুই বছর দুই মাসের মধ্যে।
অভিবাসন ও সুরক্ষা ভিসাসংক্রান্ত আপিলেও অপেক্ষার সময় দীর্ঘ। একই সময়ে নিষ্পত্তি হওয়া অভিবাসনসংক্রান্ত মামলার অর্ধেক শেষ করতে এক বছর পাঁচ মাস সময় লেগেছে। আর সুরক্ষা বা শরণার্থী ভিসার আপিলের ক্ষেত্রে এ সময় ছিল দুই বছর এক মাস।
অভিবাসন ও সুরক্ষা ভিসার মামলাও বিপুল
বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালে নতুন জমা পড়া আবেদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ অভিবাসনসংক্রান্ত। অন্যদিকে, প্রায় ২০ শতাংশ আবেদন সুরক্ষা বা আশ্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে অভিবাসনসংক্রান্ত ৮০ হাজার ৮৫৫টি এবং সুরক্ষাসংক্রান্ত ৩৭ হাজার ৫০৩টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এসব মামলা জমে থাকায় অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া শিক্ষার্থী ও অভিবাসীরাও ভিসা প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। যাঁদের পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভিসার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, তাঁদের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তবে ট্রাইব্যুনালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বর্তমানে কোন দেশের কতজন আবেদনকারী আপিলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন, তার আলাদা পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
জনবল বাড়লেও কমেনি চাপ
ট্রাইব্যুনালের সভাপতি বিচারপতি এমিলিওস কাইরু মামলার চাপের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক আবেদন সামাল দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদ পর্যাপ্ত নয়। ফলে আবেদন নিষ্পত্তিতে বেশি সময় লাগছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাইব্যুনালে সদস্য ও কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গত অর্থবছরে সদস্যসংখ্যা ১১ শতাংশের বেশি বেড়ে ৪১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে কর্মীসংখ্যা ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ২৯০ জন। তবে জনবল বাড়ানোর পরও নতুন আবেদন জমার চাপ অব্যাহত রয়েছে।
শিক্ষার্থী ভিসার আপিলে নতুন নিয়ম
শিক্ষার্থী ভিসার আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চলতি বছরের ১ জুন থেকে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। নতুন নিয়মে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের আপিল সরাসরি মৌখিক শুনানি ছাড়াই লিখিত নথি ও বক্তব্যের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার বিধান চালু হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।
যেসব শিক্ষার্থীর আপিল এখনো ট্রাইব্যুনালের কোনো সদস্যের কাছে বিচারের জন্য বরাদ্দ হয়নি, তাঁদের মামলাও নতুন নিয়মের আওতায় আসতে পারে। তবে যাঁদের শুনানির তারিখ ইতিমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মে শুনানি চলবে।
ভিসা আপিলের খরচও বেড়েছে
অস্ট্রেলিয়ায় ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে খরচও কম নয়। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সাধারণ অভিবাসন ভিসার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন ফি বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭২৭ অস্ট্রেলীয় ডলার। আর সুরক্ষা ভিসার আপিলের জন্য নির্ধারিত ফি ২ হাজার ২৯৩ ডলার, যা সাধারণত আবেদন ব্যর্থ হলে দিতে হয়। তবে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ফি কমানোর সুযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুরোনো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ আপিলস ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে নতুন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিভিউ ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম শুরু করে। সরকারি সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
তবে কার্যক্রম শুরুর দুই বছরের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তি করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনবল বৃদ্ধি ও মামলা নিষ্পত্তির নিয়মে পরিবর্তন আনার পরও নতুন আবেদনের চাপ অব্যাহত থাকায় ভিসার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা হাজারো মানুষের অনিশ্চয়তা কমাতে মামলার জট কমানোই এখন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।



