জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব: সংবিধানের জয়, ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ৪:০৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২৬
আমেরিকায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নটি শুধু একটি আইনি বিষয় নয়, এটি দেশটির সংবিধান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অভিবাসন নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ৩০ জুন ২০২৬ মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, তা আবারও প্রমাণ করেছে যে, সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সীমিত করা যায় না।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এর নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা রায় দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশু, তার পিতামাতার অভিবাসন অবস্থা যাই হোক না কেন, মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী অনুযায়ী, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভের অধিকারী; অর্থাৎ, অবৈধভাবে অবস্থানকারী কিংবা সাময়িক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্যক্তিদের সন্তানরাও এই সাংবিধানিক সুরক্ষার বাইরে নয়।
এই রায়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর সেই নির্বাহী আদেশ কার্যত বাতিল হয়ে গেল, যার মাধ্যমে তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের পরিধি সংকুচিত করতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী বা অস্থায়ীভাবে অবস্থানকারী বিদেশিদের সন্তানরা সংবিধানের ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ এখতিয়ারের আওতাভুক্ত নয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করেনি। আদালত স্পষ্ট করেছে যে, সংবিধানের ভাষা ও দীর্ঘদিনের বিচারিক ব্যাখ্যার সঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থান সাংঘর্ষিক।
এই রায় নিঃসন্দেহে ট্রাম্পের অভিবাসন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য একটি বড় ধাক্কা। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বকে অভিবাসন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরে আসছেন। তাঁর মতে, এই নীতি বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিতে উৎসাহিত করে। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা শুধু অভিবাসীদের অধিকার ক্ষুণ্ন করবে না, বরং মার্কিন সংবিধানের অন্যতম মৌলিক নীতিকেও দুর্বল করবে।
রায় ঘোষণার পর ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আদালতের সিদ্ধান্তকে “অত্যন্ত খারাপ” বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি কংগ্রেসের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। তাঁর এই প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে যে, আইনি লড়াই শেষ হলেও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।
১৮৬৮ সালে মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর থেকে আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী প্রায় সব শিশুই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভ করে আসছে। পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায় এই নীতিকে আরও সুসংহত
করেছে। ফলে এই দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ঐতিহ্যকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পরিবর্তনের উদ্যোগ শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
এই রায় শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে বাতিল করেনি; এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বকেও পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে যে, রাষ্ট্রক্ষমতা যত শক্তিশালীই হোক, সংবিধানের সীমারেখা অতিক্রম করার সুযোগ নেই।
অভিবাসন ইস্যুতে আমেরিকায় রাজনৈতিক বিভাজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অভিবাসন এবং নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো আগামী নির্বাচনগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে, সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার পরিবর্তন করতে হলে নির্বাহী আদেশ নয়, সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই একমাত্র পথ।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বহাল রেখে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট শুধু একটি আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি করেনি, বরং আমেরিকার সাংবিধানিক ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত করেছে। এই রায় মনে করিয়ে দেয় যে, গণতন্ত্রে ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসন নয়, সংবিধানই সর্বোচ্চ, এবং সেই সংবিধানের সুরক্ষাই বিচার বিভাগের প্রধান দায়িত্ব।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা



