জুলাই আন্দোলনের দুই বছর

কোটা সংস্কারের দাবি থেকে ইতিহাস বদলের যাত্রা

একটি আন্দোলন, একটি অভ্যুত্থান, এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা’।

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:১০ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২৬

২০২৪ সালের ১ জুলাই— বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল এই দিনে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে, যার পরিণতিতে দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

আজ সেই আন্দোলনের দুই বছর পূর্ণ হলো।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হওয়া কর্মসূচি ১ জুলাই থেকে শান্তিপূর্ণভাবে এগোতে থাকে। তবে ১৫ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি সহিংস রূপ নেয় এবং ১৬ জুলাই থেকে প্রাণহানির ঘটনা শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগের মধ্য দিয়ে আন্দোলন দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে তা সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়।

অবশেষে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন।

আন্দোলনের সূচনা

কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিকড় মূলত ২০১৮ সালে। সে সময় সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ওই বছরের ৪ অক্টোবর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে সরকার।

তবে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ওই পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল হয়।

এই রায়ের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলেও শিক্ষার্থীরা নতুন নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোটা বাতিলের দাবি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিক্ষোভ

৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা পুনর্বহালের রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। একই সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, জগন্নাথ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

৯ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন এবং দাবি আদায় না হলে সর্বাত্মক আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।

একই সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদল সুপ্রিম কোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে স্মারকলিপিও জমা দেন।

১ জুলাই: নতুন অধ্যায়ের সূচনা

২০২৪ সালের ১ জুলাই শিক্ষার্থীদের সমর্থনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে নতুন প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সংগঠনটির ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হওয়া মিছিল টিএসসির রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে সমাবেশে পরিণত হয়। সেখান থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

পাশাপাশি ২ জুলাই পদযাত্রা এবং ৩ ও ৪ জুলাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

আন্দোলনের বিস্তার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৪ জুলাইয়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ও একাডেমিক সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি তোলেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই দিনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতীকী অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন এবং দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

চার দফা দাবি

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—

  • ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহাল;
  • সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক ও অযৌক্তিক কোটা ব্যবস্থা বাতিল;
  • কোটাব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের জন্য একটি কমিশন গঠন;
  • সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সমতাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো জুলাই

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের দাবি ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের সেই আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দুই বছর পরও জুলাই আন্দোলন দেশের রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।