শ্বেতপত্রের আলোকেই পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯:৫১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত শ্বেতপত্রে উঠে আসা দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্যের ভিত্তিতেই বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি কমিটি গঠন করে দেশের বিভিন্ন বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র বা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এতে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির চিত্রও তুলে ধরা হয়। বর্তমান সরকার ওই শ্বেতপত্রকে সামনে রেখে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রকল্পে ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর পেছনে সাধারণত একটি কারণ দায়ী নয়। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয়প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ সমস্যা তৈরি করে।

তিনি বলেন, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্পের ব্যয় যথাযথভাবে প্রাক্কলন না করা, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয়প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, সময়মতো প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না করা, দুর্বল মনিটরিং ও জবাবদিহিতা, অর্থায়ন পরিকল্পনা ও বাজেটের মধ্যে অসামঞ্জস্য এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ার অন্যতম কারণ।

এসব সমস্যা সমাধানে নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন ও সংশোধনসংক্রান্ত নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

এ ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার এবং নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পের বিলম্ব, অনিয়ম ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণ পর্যালোচনা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস, পরিধি পরিবর্তন বা চলমান রাখার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ, সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ই-জিপির ব্যবহার বাড়ানো এবং পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকদের দায়িত্বের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করা হবে।

সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক করতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০২৫ হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পনা

শিল্প খাতে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনা করা হবে।

সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। নভেম্বর পর্যন্ত বিড দাখিলের সময়সীমা রয়েছে।

স্থলভাগে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬ প্রণয়নের কাজও চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে গড়ে দৈনিক প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে আকস্মিক গ্যাস সংকটে শিল্প খাত যাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সে জন্য মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কার্যক্রম চলছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর ল্যান্ড-বেইজড টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে রি-গ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহের আশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি গভীর সমুদ্রে সুবিধাজনক স্থান নির্বাচন করে জরুরি ভিত্তিতে নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে।

ভোলার গ্যাস শিল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনা

ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে মূল ভূখণ্ডে এনে আগ্রহী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। গ্যাসপ্রাপ্তি সাপেক্ষে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডে আনতে চাইলে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, ভোলায় শিল্পকারখানা স্থাপনের সুযোগ তৈরি করা গেলে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে ওই অঞ্চলের অর্থনীতির পরিধিও বিস্তৃত হবে। এর পাশাপাশি ভোলার গ্যাস দেশের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য একটি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

জাতীয় সংসদের অধিবেশন বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হয়। অধিবেশনের প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব।