বাংলাদেশি কর্মী বেড়েছে ৪৬%

ইউরোপে বাড়ছে কর্মীর চাহিদা, বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:২৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০২৬

উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমে গেলেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের বৈধ অভিবাসন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়া বেড়েছে ৪৬ শতাংশের বেশি। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপ বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে। তবে এই সুযোগ ধরে রাখতে দক্ষ জনশক্তি, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমান নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে গেছেন ১৮ হাজার ২২০ জন বাংলাদেশি কর্মী। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪৪৫। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইউরোপে কর্মী যাওয়া বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মী নিয়োগ ৩৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ লাখ ১৭ হাজার। ফলে সামগ্রিকভাবে বিদেশগামী কর্মসংস্থান প্রায় ২৮ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাব এবং সৌদি আরবের কঠোর ভিসা নীতির কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ইউরোপে কর্মী যাওয়ার এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ইতালিকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে বৈধ অভিবাসন উৎসাহিত করার উদ্যোগের ফলে দেশটি এখন ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইতালি ৪ হাজার ৬৪৫ জন বাংলাদেশি কর্মী নিয়েছে। তাদের বেশির ভাগই কৃষি ও মৌসুমি খাতে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।

এ ছাড়া পর্তুগাল, সার্বিয়া, রোমানিয়া, রাশিয়া ও বেলারুশেও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বাড়ছে। ইতালির সাফল্যের পর সরকার আরও সাতটি ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। সরকার মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে ইউরোপে বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপে কর্মী যাওয়া বাড়লেও তা এখনো মোট বৈধ বিদেশগামী কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশ। দক্ষ কর্মীর ঘাটতি, নথি জালিয়াতি এবং কিছু কর্মীর অবৈধভাবে অন্য দেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা ইউরোপীয় নিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, আলবেনিয়া ও মন্টেনিগ্রোর মতো কয়েকটি দেশ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে আগের তুলনায় অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে পূর্ব ইউরোপ ও বলকান অঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। মলদোভা, সাইপ্রাস, সার্বিয়া ও বসনিয়ায় নির্মাণ, কৃষি এবং সাধারণ শ্রম খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। মলদোভায় সম্প্রতি বাংলাদেশি কর্মীরা কংক্রিট নির্মাণ, পেভিং স্টোন স্থাপন, কৃষিকাজ ও যন্ত্রপাতি পরিচালনার কাজে নিয়োগ পেয়েছেন। সেখানে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী মাসিক ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলার পর্যন্ত বেতন দেওয়া হচ্ছে।

রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও ইউরোপের গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুধু যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা রেমিট্যান্সের চেয়েও বেশি। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ১৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি যুক্তরাজ্যে।

অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইউরোপের এই সম্প্রসারিত শ্রমবাজারকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে দক্ষ কর্মী তৈরি, অভিবাসন ব্যয় কমানো, নথি যাচাইয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুসরণে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ইউরোপে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আরও বড় বাজার তৈরি হবে।