ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া অভিবাসীদের ২৬ শতাংশ বাংলাদেশি
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৬:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৪, ২০২৬
ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় ঝুঁকিপূর্ণ সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথ ব্যবহারকারী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই পথে যাত্রা করা অভিবাসীদের ২৬ শতাংশই বাংলাদেশি। এরপর রয়েছেন ইরিত্রিয়া, সুদান, পাকিস্তান ও মিসরের নাগরিকেরা।
এদিকে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে অন্তত ১ হাজার ৬৬৮ জন অভিবাসী নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৩৫ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে ৮৭২ জন সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে ইউরোপে যাওয়ার সময় প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। এই পথের অন্যতম প্রধান রুট হলো উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপের দিকে যাত্রা।
লিবিয়া এখনো ইউরোপে যাওয়ার প্রত্যাশী অভিবাসীদের অন্যতম প্রধান যাত্রা ও ট্রানজিট কেন্দ্র। এনজিও অ্যালার্ম ফোনের অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশিরাই বেশি
এনজিও এসওএস মেদিতেরানের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় পথে যাত্রা করা অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বড় অংশ। এই পথে যাওয়া অভিবাসীদের ২৬ শতাংশ বাংলাদেশি।
তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন ইরিত্রিয়ার নাগরিকেরা, ১৬ শতাংশ। এরপর সুদানের ১৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ শতাংশ এবং মিসরের ৯ শতাংশ নাগরিক রয়েছেন।
২০১৬ সাল থেকে নাইজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, গিনি ও মালি থেকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ এই পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে লিবিয়া ও তিউনিসিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ২৬ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ ইউরোপে পৌঁছেছেন। আগের কয়েক বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কমলেও সমুদ্রপথে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়েছে।
আরও ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে সমুদ্রযাত্রা
অতিরিক্ত যাত্রী বহন, পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌযান এবং দীর্ঘ সমুদ্রপথ—সব মিলিয়ে অভিবাসীদের যাত্রা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
লিবিয়ার পশ্চিম উপকূলে নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় অনেক অভিবাসী এখন পূর্ব লিবিয়ার তব্রুক হয়ে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে যাত্রা করছেন। এই পথটি আগের তুলনায় অনেক দীর্ঘ।
গবেষকদের মতে, তব্রুক থেকে ইউরোপে পৌঁছাতে নৌযাত্রার দূরত্ব আগের কিছু রুটের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। গত ১৩ ও ১৪ জুলাই তব্রুক উপকূলে দুটি নৌকা ডুবে যায়। একটিতে প্রায় ৬০ জন এবং অন্যটিতে প্রায় ৩০ জন অভিবাসী ছিলেন। পরে ৫০ জনের বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
আবহাওয়া খারাপ থাকলেও ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় অনেক অভিবাসী সমুদ্রযাত্রা করছেন। এতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে সবচেয়ে বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। ওই মাসে প্রায় ৪৬০ জন মারা গেছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধার তৎপরতায় বাধার অভিযোগ
সমুদ্রে বিপদে পড়া অভিবাসীদের উদ্ধারে নিয়োজিত মানবিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন এনজিওর অভিযোগ, উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে অনেক সময় দুর্ঘটনাস্থল থেকে দূরের বন্দরে যেতে বাধ্য করা হয়। এতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা কমে যায় এবং জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকতে হয়।
২০২৩ সালে ইতালিতে কার্যকর হওয়া পিয়ান্তেদোসি ডিক্রির পর মানবিক উদ্ধারকারী জাহাজগুলোর কার্যক্রম আরও কঠিন হয়েছে বলে দাবি করেছে বিভিন্ন সংস্থা।
এসওএস মেদিতেরানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তাদের উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে ৭১ বার দূরবর্তী বন্দরের দিকে যেতে বাধ্য করা হয়। এতে জাহাজগুলোকে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৫০৯ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
এ ছাড়া লিবিয়ার কোস্টগার্ড ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিবাসী ও উদ্ধারকারী জাহাজের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে। জার্মান এনজিও সি-ওয়াচের অভিযোগ, গত মে মাসে লিবিয়ার কোস্টগার্ড তাদের ‘সি-ওয়াচ ৫’ জাহাজের ক্রুদের লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি চালায়। ওই সময় জাহাজটি সমুদ্র থেকে প্রায় ৯০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করছিল।
সব মিলিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করা অভিবাসীর সংখ্যা কমলেও সমুদ্রযাত্রার ঝুঁকি ও প্রাণহানি বাড়ছে। বিশেষ করে সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুটে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ বেশি হওয়ায় বিষয়টি বাংলাদেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।



