সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়, চাপে ভুচিচের শিবির
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ১:৪৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন আলেকসান্দার ভুচিচ। তবে দীর্ঘদিনের সেই রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় ধাক্কা এসেছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কাছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) আগাম সংসদীয় নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন ভুচিচ। প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটের প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে ভুচিচ বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক শিবির নির্বাচনে হেরেছে। ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে বলে তিনি জানান। অন্যদিকে, তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের আসনসংখ্যা ১০৫ হতে পারে বলে উল্লেখ করেন। তবে তখনও চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত হয়নি। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ, যা ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
যেভাবে আন্দোলন থেকে নির্বাচনী মঞ্চ
২০২৪ সালের নভেম্বরে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এই ঘটনার পর সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। ঘটনার দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমিক ও সাধারণ নাগরিকেরাও যুক্ত হন। একপর্যায়ে আন্দোলনটি শুধু প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে নির্বাচনী মঞ্চ গড়ে ওঠে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামে।
এই মঞ্চের প্রচারণায় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
ভুচিচ ও তাঁর দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) অবশ্য তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ভুচিচ বিক্ষোভকারীদের একাংশকে ‘অবরোধকারী’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে সার্বিয়াকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগও তুলেছিলেন।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও অসন্তোষ কেন?
ভুচিচের রাজনৈতিক উত্থানের সময় সার্বিয়ার অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, এ সময়ে দেশটির বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, মোট দেশজ উৎপাদন বেড়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে মহাসড়ক নির্মাণকে তাঁর সমর্থকেরা সরকারের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মজুরি বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। সরকারি ঋণ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়েও বিতর্ক চলেছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এসব অসন্তোষকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। আন্দোলনকারীদের দাবি, দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ক্ষমতার কেন্দ্রে ভুচিচ
আলেকসান্দার ভুচিচ ২০১২ সালে সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী এবং ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন। ২০২২ সালে তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন ভুচিচ। আগাম সংসদীয় নির্বাচনে তাঁর দল জয়ী হলে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত। তবে নির্বাচনে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর এগিয়ে থাকার প্রাথমিক হিসাব তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুচিচের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ার অভিযোগ তুলেছেন সমালোচকেরা। মানবাধিকার সংগঠন ও সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিরোধীদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত করার প্রবণতা বেড়েছে। সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতি থেকে ক্ষমতার শীর্ষে
১৯৭০ সালে বেলগ্রেডে জন্ম নেওয়া ভুচিচ বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী সার্বিয়ান র্যাডিক্যাল পার্টিতে যোগ দেন। পরে দলটির বিভক্তির পর ২০০৮ সালে তোমিস্লাভ নিকোলিচের সাথে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তী সময়ে ভুচিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নে সার্বিয়ার সদস্যপদ পাওয়ার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেন। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতিও অনুসরণ করেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পরও মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে তিনি সম্মত হননি।
১৯৯৫ সালে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার পর সার্বিয়ার সংসদে দেওয়া ভুচিচের একটি বক্তব্যও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে। ওই বক্তব্যে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার হুমকি দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামনে কী?
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের নির্বাচনী সাফল্য সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে প্রাথমিক ফলাফলকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে নির্বাচনী জয়কে বাস্তব রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে নতুন প্রতিনিধিদের দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো দাবিগুলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী অসন্তোষকে নির্বাচনী সমর্থনে রূপ দিতে পেরেছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এখন সেই সমর্থনকে কার্যকর সংস্কারে পরিণত করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হবে তাদের সামনে বড় পরীক্ষা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা।



