চার ধর্মের তীর্থক্ষেত্র কৈলাস-মানস সরোবর
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ২:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩১, ২০২৬
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতায় নীল জলরাশির মানস সরোবর। এর পাশেই প্রায় ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু কৈলাস পর্বত। বছরের বড় সময় বরফে ঢাকা থাকে পৃথিবীর অন্যতম দুর্গম এই অঞ্চল। তীব্র ঠান্ডা, অক্সিজেনের স্বল্পতা, দুর্গম পাহাড়ি পথ ও হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের ঝুঁকি সত্ত্বেও শত শত বছর ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষ ছুটে আসছেন এই পবিত্র ভূমিতে।
তিব্বতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত কৈলাস-মানস সরোবর শুধু একটি ভৌগোলিক বিস্ময় নয়; হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও তিব্বতের বন ধর্ম—এই চার ধর্মের অনুসারীদের কাছেই এটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান।
চার ধর্মে চার বিশ্বাস
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৈলাস পর্বত দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত। মানস সরোবরও তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই হ্রদের পবিত্র জলে স্নান আত্মিক শুদ্ধি ও পাপমোচনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বৌদ্ধদের কাছে কৈলাস ‘কাং রিনপোচে’ বা ‘তুষারের মূল্যবান রত্ন’ নামে পরিচিত। তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে এই পর্বতকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানস সরোবরের তীরেও বহু সন্ন্যাসী দীর্ঘদিন ধরে ধ্যান ও সাধনা করেছেন।
জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বিশ্বাস, প্রথম তীর্থঙ্কর ঋষভদেব এই অঞ্চলে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। অন্যদিকে তিব্বতের প্রাচীন বন ধর্মের অনুসারীদের কাছেও কৈলাস একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক সাধনাস্থল।
পর্বতে ওঠেন না তীর্থযাত্রীরা
কৈলাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তীর্থযাত্রীরা সাধারণত এর চূড়ায় ওঠেন না। বরং পর্বতটিকে চারপাশ থেকে প্রদক্ষিণ করেন। হিন্দুদের কাছে এই প্রদক্ষিণ ‘পরিক্রমা’ এবং তিব্বতি বৌদ্ধদের কাছে ‘কোরা’ নামে পরিচিত।
প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পরিক্রমাপথ সাধারণত তিন দিনে শেষ করা হয়। তবে শারীরিক সক্ষমতা ও আবহাওয়ার ওপর সময়ের তারতম্য হতে পারে। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ আবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করতে করতে পুরো পথ অতিক্রম করেন। উচ্চতার কারণে এই যাত্রা শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর।
চার নদীর উৎসভূমি
কৈলাস-মানস সরোবরের গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় কারণে নয়, ভৌগোলিক দিক থেকেও অসাধারণ। এ অঞ্চল থেকে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদীর জলপ্রবাহের উৎপত্তি হয়েছে। সিন্ধু, শতদ্রু, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণালী নদীর উৎসাঞ্চল এই বৃহত্তর অঞ্চলের কাছাকাছি।
মানস সরোবর একটি স্বাদু পানির হ্রদ। এর আয়তন প্রায় ৪১২ বর্গকিলোমিটার এবং গভীরতা প্রায় ৪৬ মিটার। এর পাশেই রয়েছে রাক্ষসতাল, যার পানি লবণাক্ত। পাশাপাশি থাকা দুই হ্রদের পানির বৈশিষ্ট্যের এই পার্থক্যও অঞ্চলটির অন্যতম আকর্ষণ।
দুর্গম তীর্থযাত্রা
কৈলাস ও মানস সরোবর তিব্বতে অবস্থিত, যা চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। অঞ্চলটি ভারত ও নেপালের সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় বিভিন্ন দিক দিয়ে সেখানে যাওয়ার পথ রয়েছে। ভারতের লিপুলেখ পাস ও নাথু লা পাস হয়ে এবং নেপাল হয়ে তিব্বতে প্রবেশের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিদেশি তীর্থযাত্রীদের ক্ষেত্রে চীনের ভিসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিশেষ অনুমতিও লাগে। নেপাল হয়ে যাওয়া একটি প্রচলিত পথ। তবে পুরো যাত্রায় উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, তীব্র ঠান্ডা, ভূমিধস, হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনসহ নানা ঝুঁকি রয়েছে।
দুর্গমতা ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কৈলাস-মানস সরোবরের আকর্ষণ কমেনি। ধর্মীয় বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য—সব মিলিয়ে হিমালয়ের এই অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম অনন্য তীর্থভূমি হিসেবে আজও মানুষের কৌতূহল ও ভক্তির কেন্দ্র হয়ে আছে।



