মালয়েশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে শ্রমিকদের নিয়ে দাসত্বের অভিযোগ
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৬:২৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
মালয়েশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে গিয়ে ভয়াবহ শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসী শ্রমিকেরা। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, মাসের পর মাস বেতন না দেওয়া, জাল পাসপোর্ট ব্যবহার এবং এক কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে শ্রমিকদের হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক একটি পাচারচক্রের বিরুদ্ধে। মালয়েশিয়ার লজিস্টিকস, কৃষি ও মোটরযান প্রস্তুতকারক শিল্পে শ্রমিকদের শোষণের এ চিত্র উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যম মালয়েশিয়া নাউয়ের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারের শ্রমিকদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এবং বেতন দাবি করলে অন্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাকরির প্রলোভনে গিয়ে নির্যাতন
প্রতিবেদনে ভারতের উত্তর প্রদেশের মোজাফফরনগরের তিন তরুণ রামজান, দানিশ ও বাববারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের মাসে ২ হাজার ১২৭ মালয়েশীয় রিঙ্গিত বেতনে বাদাম প্যাকেটজাত করার কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কুয়ালালামপুরে নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে পৌঁছানোর পর ইশা নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাঁদের মূল পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কোনো সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই তাঁদের প্রতিদিন ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ৩০ থেকে ৫০ কেজি ওজনের বাক্স বহন করতে বাধ্য করা হতো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেতন দাবি করলে কিংবা দেশে ফিরে যেতে চাইলে শ্রমিকদের অন্য বড় প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে কাজ করতে পাঠানো হতো। গত সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরতে সক্ষম হওয়া ৩৭ বছর বয়সী বাববার জানান, পাঁচ মাসে তাঁকে তিনটি বড় কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ভারতীয় শ্রমিকদের নিয়োগসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আড়াল করতে তাঁর হাতে নেপালি পাসপোর্ট তুলে দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জোর করে ভিডিও ধারণের অভিযোগ
পাচারের শিকার শ্রমিকদের উদ্ধার ও আইনি পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত করতে তাঁদের দিয়ে জোরপূর্বক ভিডিও ধারণের অভিযোগও উঠেছে। এসব ভিডিওতে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও ভালো অবস্থায় থাকার কথা বলতে বাধ্য করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের জাতীয় বন্ধকী শ্রমিক নির্মূল কমিটির আহ্বায়ক নির্মল গোরানা বলেন, এ ধরনের সাজানো ভিডিওর কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো বিভ্রান্ত হতে পারে। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্বীকারও রয়েছে
ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর একটি প্রতিষ্ঠান সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অবৈধ বিদেশি শ্রমিক নিয়োগের কোনো রেকর্ড তাদের কাছে নেই। সরকারি দপ্তর ও ভারতীয় হাইকমিশনের তদন্তেও তারা সহযোগিতা করেছে এবং তাদের নথিপত্র বৈধ।
তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মালয়েশিয়ার কয়েকটি বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রবিহীন শ্রমিকদের কম খরচে কাজে লাগাচ্ছে।
মালিকনির্ভর ব্যবস্থায় আইনি ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নীতিমালা অনুযায়ী, জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তানির্ভর অভিবাসন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের আইনি অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে নির্যাতনের কথা বললে কিংবা চাকরি ছাড়তে চাইলে শ্রমিকেরা তাঁদের বৈধ অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন। এর ফলে শোষণের শিকার হয়েও অনেকে অভিযোগ করতে সাহস পান না।
অভিযোগ করেও মিলছে না প্রতিকার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুক্তভোগী শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘মাদাদ’ (MADAD) পোর্টালে সহায়তা চেয়েছেন। তবে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রত্যাশিত সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ভারতের মিরাট ও মোজাফফরনগর থানায় ইশা এবং তাঁর সহযোগী নদীম, তালিব, তৈয়ব ও দিলশাদের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর (FIR) করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তরা এখনো গ্রেপ্তার হননি বলে দাবি করা হয়েছে।
নির্মল গোরানার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সংস্থা মালয়েশিয়ায় পাচারের শিকার হয়ে দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে থাকা ২০ জনের বেশি ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় শ্রমিকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
ভুক্তভোগীদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা এবং শ্রমিক শোষণের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শ্রম অধিকারকর্মীরা।



