যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে মুখ খুললেই হত্যার হুমকি ইরাকে

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৭:১২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২৬

ইরাকে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো নারীদের হত্যার হুমকি, সামাজিক অপমান ও নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আনা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার দাবিতে কাজ করতে গিয়ে হুমকি পাচ্ছেন নারী অধিকারকর্মীরাও। দুর্বল আইনি সুরক্ষা, সামাজিক কলঙ্ক ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাজধানী বাগদাদের একটি ব্যস্ত সড়কে যৌন হয়রানির শিকার এক নারী প্রতিবাদ জানালে এক চালক তাঁকে গাড়ির দরজা খুলতে বাধা দেন। ঘটনাটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন নারী অধিকারকর্মী সারা জাসিম। ইনস্টাগ্রামে এ ধরনের ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে তিনি নারীদের হয়রানি ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন।

তবে এ কাজ করতে গিয়ে জাসিম নিজেই নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে হত্যার পাশাপাশি অ্যাসিড হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। নারীদের হয়রানির বিরুদ্ধে সরব হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে অশালীনতা ছড়ানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে এখন তিনি খুব কমই বাড়ির বাইরে বের হন।

আইনি সুরক্ষার ঘাটতি

ইরাকে যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় আরও কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন জাসিম। তাঁর মতে, প্রচলিত দণ্ডবিধিতে এসব অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা ও স্বীকৃতির ঘাটতি রয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ জরুরি।

যৌন নির্যাতনের শিকার অনেক নারী অভিযোগ করেছেন, তাঁদের সুরক্ষা দিতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। অধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের মতে, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। মামলার ফলাফল নিয়েও অনিশ্চয়তা থাকে।

নারীদের প্রতি বৈষম্যবিষয়ক জাতিসংঘের একটি কমিটির মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ব্যাপক হলেও অনেক ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী আইন প্রণয়ন এবং বৈষম্যমূলক আইন বাতিলের সুপারিশ করেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির কিছু আইনি বিধানের কারণে ধর্ষক ভুক্তভোগীকে বিয়ে করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তথাকথিত ‘সম্মান রক্ষার’ নামে হত্যার ঘটনায় শাস্তি কমানোর সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

মেয়েকে নির্যাতনের বিচারে পাঁচ বছরের লড়াই

ইরাকের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ আমালের ঘটনা। নিরাপত্তার কারণে তাঁর আসল নাম প্রকাশ করা হয়নি। আমালের অভিযোগ, তাঁর সাবেক স্বামী অস্ত্রের মুখে তাঁদের অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বারবার ধর্ষণ করেছেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আদালতে লড়ছেন তিনি।

মেয়ের কাছ থেকে শোনা অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে আমাল জানান, একবার তাঁর সাবেক স্বামী মেয়ের ঘরে ঢুকে বিছানায় অস্ত্র রেখে হুমকি দিয়েছিলেন, ‘আমি তোকে মেরে ফেললেও কেউ তোর চিৎকার শুনতে পাবে না।’

আমালের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের কবজিতে অসংখ্য কালশিটে দাগ ছিল। তাঁর সাবেক স্বামী মেয়েটির হাত শক্ত করে ধরে রাখতেন এবং চিৎকার করতে গেলে মুখ চেপে ধরতেন। অভিযোগের সমর্থনে আমাল ডিএনএ পরীক্ষার প্রমাণসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিও দেখিয়েছেন।

আমালের দাবি, তাঁর সাবেক স্বামী পরিবারের এক সদস্যকে বলেছিলেন, গ্রেপ্তার হলে যেন কেউ ‘কলঙ্ক মুছে ফেলে’। আমালের আশঙ্কা, চিকিৎসা প্রতিবেদনে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ প্রকাশ ঠেকাতেই তাঁর মেয়েকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাল বলেন, ‘আমি একাই লড়েছি।’ তাঁর চাওয়া, সাবেক স্বামী যেন চিরদিনের জন্য তাঁর জীবন থেকে সরে যান।

নারী অধিকারকর্মীদের ওপর হামলা

ইরাকে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় পাওয়া কঠিন। অনেকের নিজস্ব আয় নেই, আবার নির্যাতন থেকে বাঁচতে যাওয়ার মতো জায়গাও নেই। এর মধ্যে নারী অধিকারকর্মীদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

নির্যাতিত নারীদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত নারী অধিকারকর্মী ইয়ানার মোহাম্মদ। গত মার্চে বাগদাদে নিজের বাড়ির বাইরে সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় তিনি নিহত হন। এখন পর্যন্ত তাঁর হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের বিশেষজ্ঞরা গত এপ্রিলে জানান, ইয়ানার মোহাম্মদ বছরের পর বছর প্রাণনাশের হুমকি ও অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। এসব হুমকির পেছনে চরমপন্থী ধর্মীয় মিলিশিয়াদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে ধারণা করা হয়।

নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁদের সহকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বেড়েছে। বিশিষ্ট নারী অধিকারকর্মী হানা এডওয়ার জানান, নিহত হওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তিনি ইয়ানার মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনিও হুমকি পেয়েছেন বলে জানান।

হানা এডওয়ারের ভাষায়, ‘ইরাকে নারীদের জন্য কোনো আইন নেই, কোনো সুরক্ষা নেই, কোনো ন্যায়বিচারও নেই।’

ইরাকি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান মুস্তফা সাদুনের মতে, সমস্যাটি শুধু নারীদের নীরব থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁরা কথা বললেও তাঁদের অভিযোগ শোনা ও প্রতিকার দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

তিনি বলেন, যৌন সহিংসতার অভিযোগ নিয়ে একজন নারীকে প্রথমে পরিবারের, এরপর পুলিশের এবং সবশেষে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়। প্রতিটি পর্যায়েই তাঁকে অনেক সময় অভিযোগ প্রকাশ না করে আপস করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

রাস্তায় চলাচলেও নিরাপত্তাহীনতা

ইরাকে অনেক নারীর কাছে রাস্তায় হাঁটা কিংবা গণপরিবহনে যাতায়াতও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সামাজিক লজ্জা, পরিবারের বাধা ও পুলিশের কাছ থেকে সহায়তা না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রকাশ করতে চান না।

বিবিসিকে সামিরা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী জানান, একবার গণপরিবহনে এক ব্যক্তি তাঁর সামনে ফোনে পর্নোগ্রাফি দেখান। আরেক দিন বাগদাদে এক ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে ১০ মিনিটেরও বেশি সময় তাঁকে অনুসরণ করেন। পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েও সহায়তা পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

পরিবারের কাছেও এসব ঘটনা প্রকাশ করতে ভয় পান সামিরা। তাঁর আশঙ্কা, বিষয়টি জানালে নিরাপত্তার অজুহাতে তাঁকে বাড়ির বাইরে যেতে নিষেধ করা হতে পারে। তাঁর মতে, অনেক পুরুষ এমনকি কিছু পুলিশ কর্মকর্তাও যৌন হয়রানিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখেন না।

তবে ইরাকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মুকদাদ মিরি বলেছেন, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও চাকরি থেকে বরখাস্তের বিধান রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে পুলিশ প্রায় ৩০০টি যৌন সহিংসতার অভিযোগ পেয়েছে। সামাজিক রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না বলেও স্বীকার করেন তিনি।

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক কলঙ্ক, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা নারীদের ন্যায়বিচার চাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁদের দাবি, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত, নিরাপদ আশ্রয় ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।