দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা, প্রতিরোধ বাড়ানোর পরিকল্পনা ফিলিপাইনের
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৮:১৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের সামরিক ও কোস্টগার্ড জাহাজের উপস্থিতি এক মাসে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিপাইন। সমুদ্রসীমায় চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা মোকাবিলায় শুধু ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশের নীতি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, সামরিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং তথ্যপ্রচার কৌশলে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ চারমেইন মিসালুচা-উইলববি।
সাগরে চীনের জাহাজের উপস্থিতি দ্বিগুণ
ফিলিপাইনের পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের তথ্য অনুযায়ী, পালাওয়ান প্রদেশের ফিলিপাইন-নিয়ন্ত্রিত কোটা দ্বীপের কাছে চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার ২২টি জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। চীনা সামুদ্রিক মিলিশিয়ার ৯৬২২ নম্বর জাহাজটি ২২টি ছোট নৌযান নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ পর একই এলাকায় ফিরে আসে। ফিলিপাইনের অভিযোগ, এসব নৌযান সেখানে অনুমতি ছাড়া মাছ ধরা ও সমুদ্রে বর্জ্য ফেলার কাজে যুক্ত ছিল।
এ ছাড়া ৮ অক্টোবর আয়ুঙ্গিন শোল এলাকায় ফিলিপাইনের একটি চিকিৎসা ও উদ্ধার মিশনে চীনের কোস্টগার্ড জলকামান ব্যবহার করে বলে অভিযোগ করেছে ম্যানিলা। ওই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজ থেকে আহত এক ফিলিপিনো সেনাকে সরিয়ে নেওয়া।
ফিলিপাইনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে পাক-আসা দ্বীপ, আয়ুঙ্গিন শোল, এসকোদা শোল ও স্কারবরো শোলের আশপাশে চীনের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের মোট ১০১টি জাহাজ শনাক্ত করা হয়। আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ৫৬।
অচল হয়ে পড়ছে সমঝোতা
উত্তেজনা কমানো ও ভুল বোঝাবুঝি থেকে সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাস করতে ২০২৪ সালে চীন ও ফিলিপাইন একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছেছিল। তবে এরপরও ২৫ সেপ্টেম্বর বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে সেনা পরিবর্তন ও রসদ সরবরাহের মিশনে চীনের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করে ফিলিপাইন।
এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর ফিলিপিনো জেলেদের কাছে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার পথে চীনের কোস্টগার্ডের একটি জাহাজের ধাক্কায় ফিলিপাইনের নৌযান বিআরপি দাতু মাগাত সালামাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানানো হয়।
১৯৯৯ সালে ফিলিপাইন ইচ্ছাকৃতভাবে বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজটি আয়ুঙ্গিন শোলে আটকে রাখে। কাছের মিসচিফ রিফে চীনের সামরিক উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের প্রেক্ষাপটে কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার উদ্দেশ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
শুধু তথ্য প্রকাশে কি ঠেকবে চীনকে?
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেছেন, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা সামাল দেওয়া এবং সংঘাতের বিস্তার এড়ানোর বাস্তবতা তাঁর দেশ মেনে নিয়েছে। তবে এটিকে চীনের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখা উচিত নয়।
চীনের কর্মকাণ্ডের ছবি, ভিডিও ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনসচেতনতা বাড়ানো, অপতথ্যের মোকাবিলা করা এবং ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক সালিশি রায় বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করাই ফিলিপাইনের এই নীতির লক্ষ্য।
তবে লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে চীনের কর্মকাণ্ড সামনে আনা হলেও সেটি এককভাবে দেশটির আচরণ বদলাতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
প্রতিরক্ষা ও সামরিক অংশীদারত্বে জোর
ফিলিপাইনের সরকারের ‘কমপ্রিহেনসিভ আর্কিপেলাজিক ডিফেন্স কনসেপ্ট’ বা সমন্বিত দ্বীপপুঞ্জ প্রতিরক্ষা ধারণায় সামরিক ঘাঁটি বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া, দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকের মতে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশি সামরিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ, অস্ত্র মোতায়েন এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সামরিক সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করা জরুরি।
চীনের তথ্যপ্রচারের মোকাবিলায় শুধু ঘটনা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। জাতীয় স্বার্থ, অভিন্ন মূল্যবোধ ও কোন সীমা অতিক্রম করা যাবে না—এসব বিষয়ে ফিলিপাইনের বক্তব্য ও পদক্ষেপের মধ্যে সমন্বয় আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশটির অধিকাংশ মানুষ খবর ও তথ্যের জন্য ফেসবুকের ওপর নির্ভর করায় ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
আঞ্চলিক নেতৃত্বের সুযোগ
২০২৬ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ফিলিপাইন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধ মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষক।
তাঁর মতে, মিয়ানমারের সংকট, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত বিরোধ ও দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনার মতো বিষয়ে আসিয়ান কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারলে সংস্থাটির আঞ্চলিক নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের তৎপরতা মোকাবিলায় তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদি ফল পেতে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, সামরিক অংশীদারত্ব, ডিজিটাল জবাবদিহি ও আঞ্চলিক কূটনীতিকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।



