ওজন কমানোর ওষুধ, সুগন্ধির বাজারে নতুন গবেষণা
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ২:১৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
চেরি, ক্যারামেল, কলা-ক্রিমের মিষ্টান্ন কিংবা তিলের ঘ্রাণ—খাবারের সুবাসযুক্ত সুগন্ধি এখন বিলাসবহুল সুগন্ধির বাজারে বেশ জনপ্রিয়। এই ধারার সুগন্ধি ‘গুরমাঁ’ নামে পরিচিত। তবে ওজন কমানোর ওষুধ মানুষের সুগন্ধি বেছে নেওয়ার পছন্দে প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে সুগন্ধি প্রস্তুতকারকদের মধ্যে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওজন কমাতে ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ব্যবহারকারীদের ঘ্রাণের প্রতি আগ্রহ ও পছন্দে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, তা খতিয়ে দেখছে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। তবে গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
খাবারের ঘ্রাণযুক্ত সুগন্ধির জনপ্রিয়তা
খাবারের ঘ্রাণ থেকে অনুপ্রাণিত সুগন্ধি কয়েক দশক ধরেই বাজারে রয়েছে। এর পরিচিত উদাহরণ থিয়েরি মুগলারের ‘অ্যাঞ্জেল’, যাতে তুলার মিছরির ঘ্রাণ রয়েছে, এবং নিনা রিচির ‘নিনা’, যাতে ক্যারামেল দেওয়া আপেলের সুবাসের বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় অনলাইনে কেনাকাটা বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের সুগন্ধির বাজারও প্রসারিত হয়। পরিচিত খাবারের ঘ্রাণের ধারণা থাকায় ক্রেতারা সরাসরি শুঁকে না দেখেও পণ্য কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পাশাপাশি জেন-জি প্রজন্মের ক্রেতাদের প্রভাবও এই বাজারের প্রবণতা বদলেছে।
এখন সুগন্ধি প্রস্তুতকারকেরা পরিচিত মিষ্টি ঘ্রাণের পাশাপাশি নানা ধরনের খাবারের সুবাস নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন।
ওষুধের প্রভাব নিয়ে কেন আগ্রহ?
নোভো নরডিস্কের ওয়েগোভি ও এলি লিলির মাউনজারোর মতো জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ওজন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়। এসব ওষুধের সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে বমি বমি ভাব ও হজমের সমস্যা রয়েছে।
গবেষকেরা এখন খতিয়ে দেখছেন, ক্ষুধা কমানোর পাশাপাশি এসব ওষুধ মানুষের স্বাদ ও ঘ্রাণ অনুভবেও প্রভাব ফেলে কি না। মদ্যপানের আকাঙ্ক্ষা কিংবা জুয়া খেলা ও হঠাৎ কেনাকাটার প্রবণতার মতো আচরণে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা চলছে।
আমেরিকার জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন জাতীয় ঘ্রাণ ও স্বাদকেন্দ্রের সহপরিচালক পল জোসেফের মতে, ওষুধগুলো ঘ্রাণ ও স্বাদ অনুভবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন ধারণা অমূলক নয়। তবে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সুগন্ধি প্রস্তুতকারকদের গবেষণা
বিশ্বের বড় সুগন্ধি ও খাবারের স্বাদ তৈরির প্রতিষ্ঠান জিভোদান ও আইএফএফ, সুগন্ধি প্রস্তুতকারক সিপিএল অ্যারোমাস এবং প্রসাধনসামগ্রী প্রতিষ্ঠান লরিয়াল এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে।
আইএফএফের গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ ব্যবহারকারীদের কাছে ঘ্রাণ আনন্দ ও অনুভূতি উপভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক পরিচালক সেলিন মানেত্তা বলেন, এ ধরনের গবেষণার ফল কাজে লাগিয়ে মানুষের আবেগ ও অনুভূতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সুগন্ধি তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
লরিয়ালও মনে করছে, খাবার থেকে পাওয়া আনন্দ কমে গেলে কেউ কেউ অন্য উপায়ে সেই আনন্দ খুঁজতে পারেন। সুগন্ধি হতে পারে তার একটি মাধ্যম।
সুইজারল্যান্ডের সুগন্ধি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জিভোদান প্রায় এক বছর ধরে সম্ভাব্য এই সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছে। প্রতিষ্ঠানটির বিলাসবহুল সুগন্ধি বিভাগের বৈশ্বিক বিপণনপ্রধান আর্নো গুগেনবুলের মতে, ওষুধ ব্যবহারের ফলে কারও কারও সুগন্ধির পছন্দ বদলাতে পারে। আগে যে ঘ্রাণ ভালো লাগত, পরে সেটি বিরক্তিকর মনে হতে পারে; আবার আগে অপছন্দের ঘ্রাণও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে এসব পর্যবেক্ষণ থেকে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি।
সুগন্ধির বাজারে নতুন প্রবণতা
জিভোদান খাবারের ঘ্রাণযুক্ত সুগন্ধির সংগ্রহ বাড়াচ্ছে। তাদের পরীক্ষাধীন উপাদানের মধ্যে রয়েছে ব্যানোফি পাই, ইতালির ঐতিহ্যবাহী প্যানেত্তোনে কেক এবং কাপকেকের মতো খাবারের ঘ্রাণ।
অন্যদিকে, সুগন্ধির বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিষ্টি ঘ্রাণের পাশাপাশি মসলা, তিল, মিসো, চাল, ট্রাফল ও ম্যাচার মতো উপাদান থেকেও অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন প্রস্তুতকারকেরা। ফলে খাবারের ঘ্রাণযুক্ত সুগন্ধির ধরন আরও বৈচিত্র্যময় হচ্ছে।
তবে এই বাজারের প্রবৃদ্ধির পেছনে জিএলপি-১ ওষুধের প্রভাব কতটা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সুগন্ধি প্রস্তুতকারকদের আগ্রহ বাড়লেও ওষুধ ব্যবহারের কারণে মানুষের সুগন্ধি পছন্দ বদলে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।



