নির্যাতন-পাচারের অভিযোগ
সাত বছরে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী কর্মী
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২৬
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় গিয়ে প্রতারণা, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নারী। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে প্রায় ৭০ হাজার নারী কর্মী বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শোষণ এবং প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহও দেশে ফিরেছে।
প্রেম ও বিয়ের প্রলোভনে পাচার
নারী পাচারের ক্ষেত্রে নতুন করে সামনে এসেছে প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশি নারীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কয়েক মাস যোগাযোগের পর বাংলাদেশে এসে পরিবারের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। এরপর বিয়ে কিংবা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের নভেম্বরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কের মাধ্যমে দুই বাংলাদেশি নারীকে চীনে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
এরপর ২০২৫ সালের মে মাসেও একই ধরনের অভিযোগে আরও দুই চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার হন। তদন্তসংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা যায়, স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হতো।
চাকরির প্রলোভনেও পাচার
শুধু প্রেম বা বিয়ের প্রলোভন নয়, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতিও নারী পাচারের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরা এক নারী অভিযোগ করেছেন, মাসে এক লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তার পাসপোর্ট ও টাকা কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একপর্যায়ে নির্যাতন ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার চেষ্টা করা হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন এবং ব্র্যাকের Migration Welfare Centre-এর সহায়তায় দেশে ফেরেন।
সৌদি আরব থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাকরির আশ্বাসে দেশটিতে যাওয়ার পর এক নারীকে আটকে রেখে মারধর, খাবার থেকে বঞ্চিত করা এবং যৌন নির্যাতনের শিকার করার অভিযোগ উঠেছে।
যাচাই ছাড়া বিদেশে না যাওয়ার পরামর্শ
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে ভিসা, চাকরির নিয়োগদাতা, চুক্তিপত্র এবং বিদেশি নাগরিক বা এজেন্টের পরিচয় যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসানের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে নারীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি নারীদের দ্রুত উদ্ধার, আইনি সহায়তা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। নারী পাচার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, দূতাবাস এবং অভিবাসন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে নারী পাচার ও নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, এটি এখন একটি বড় সামাজিক ও অভিবাসন সংকট। তাই নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বিদেশে যাওয়ার আগে যাচাই-বাছাই এবং সচেতনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।



