ভিজিটর ভিসা পেয়েছেন, এবার দায়িত্বশীল হতে হবে

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৯:৪২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬

আমেরিকার ভিজিটর ভিসা পাওয়া অনেক বাংলাদেশির কাছে একটি কাঙ্ক্ষিত অর্জন। দীর্ঘ প্রস্তুতি, DS-160 পূরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সাক্ষাৎকার এবং নানা অনিশ্চয়তার পর যখন পাসপোর্টে B1/B2 ভিসা যুক্ত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আনন্দের সৃষ্টি হয়। কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ভিসা পাওয়া মানেই আমেরিকায় গিয়ে যা ইচ্ছা তা করার অনুমতি পাওয়া নয়। বরং ভিসা পাওয়ার পরই শুরু হয় ভিসার শর্ত মেনে চলার দায়িত্ব।

সম্প্রতি আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা বাংলাদেশিদের B1/B2 ভিজিটর ভিসায় কোন কোন কাজ করা যাবে না, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে। দূতাবাসের এই বার্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ ভিসার ধরন এবং ভ্রমণের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে ভিসা জটিলতা তৈরি করতে পারে।

B1/B2 ভিজিটর ভিসা মূলত অস্থায়ী ব্যবসায়িক কার্যক্রম, পর্যটন, অবকাশযাপন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা কিংবা চিকিৎসার মতো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য। তাই ভিসা পাওয়ার পর প্রথম করণীয় হলো—নিজের ভ্রমণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা এবং সেই উদ্দেশ্যের বাইরে কোনো কর্মকাণ্ডে না জড়ানো।

ভিসা হাতে পাওয়ার পর প্রথম দায়িত্ব

অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে—পাসপোর্টে ভিসা থাকলেই আমেরিকায় প্রবেশ নিশ্চিত। বাস্তবে ভিসা হলো আমেরিকায় ভ্রমণের জন্য প্রবেশের আবেদন করার সুযোগ। চূড়ান্তভাবে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সীমান্ত কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার।

তাই ভিসা পাওয়ার পর ভ্রমণের প্রস্তুতির সময় নিজের DS-160-এ দেওয়া তথ্য, সাক্ষাৎকারে দেওয়া তথ্য এবং বর্তমান ভ্রমণের উদ্দেশ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন, কেউ যদি পর্যটনের কথা বলে B2 ভিসা নিয়ে আমেরিকায় যান, তাহলে সেখানে গিয়ে নিয়মিত চাকরি বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ শুরু করা যাবে না। একইভাবে ব্যবসায়িক সফরের কথা বলে গিয়ে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন অবস্থান করার চেষ্টা করাও ঝুঁকিপূর্ণ।

ভিজিটর ভিসায় কাজ নয়

আমেরিকান দূতাবাসের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—B1/B2 ভিসায় গিয়ে এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যার জন্য আমেরিকার কোনো নিয়োগকর্তা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে পারিশ্রমিক পাওয়া যায়।

এখানে বাংলাদেশি ভিসাপ্রাপ্তদের বিশেষভাবে সতর্ক হতে হবে। আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতজনের মাধ্যমে কোনো চাকরি, নিয়মিত কাজ কিংবা পারিশ্রমিকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ এলেই তা গ্রহণ করা উচিত নয়।

অনেকে হয়তো মনে করেন, কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ কাজ করলে সমস্যা হবে না। এই ধারণা ভুল। ভিসার শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কর্মকাণ্ডের সময়কাল ছোট হলেই সেটি বৈধ হয়ে যায় না।

পড়াশোনার ক্ষেত্রেও সতর্কতা

B1/B2 ভিজিটর ভিসা নিয়ে গিয়ে ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেডিট অর্জনের উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করাও অনুমোদিত নয়। ফলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত একাডেমিক প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়ার আগে ভিসার ধরন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ম অবশ্যই যাচাই করতে হবে।

শুধু ‘কোর্স’ শব্দটি দেখেই সব ধরনের পড়াশোনাকে একইভাবে দেখা যাবে না। স্বল্পমেয়াদি, অনুমোদিত কার্যক্রম এবং ডিগ্রি বা একাডেমিক ক্রেডিটের জন্য পড়াশোনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি আমেরিকার সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।

বার্থ ট্যুরিজম থেকে দূরে থাকতে হবে

দূতাবাসের সতর্কবার্তায় বার্থ ট্যুরিজমের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। শিশুর আমেরিকান নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে আমেরিকায় গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে ভিজিটর ভিসা ব্যবহার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এ ধরনের উদ্দেশ্য থাকলে ভিসা আবেদন, প্রবেশ এবং ভবিষ্যৎ ভিসা আবেদনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন করে ভিসা নেওয়া কিংবা ভিন্ন উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকা উচিত।

ভিসার মেয়াদ আর অবস্থানের অনুমোদন এক বিষয় নয়

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের মনে রাখা দরকার—ভিসার মেয়াদ এবং আমেরিকায় থাকার অনুমোদিত সময় এক জিনিস নয়।

ভিসা কয়েক বছর মেয়াদি হতে পারে। কিন্তু প্রতিবার আমেরিকায় প্রবেশের সময় কতদিন অবস্থান করা যাবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। তাই ‘আমার ভিসা পাঁচ বা দশ বছরের, ফলে আমি যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারব’—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমেরিকা ত্যাগ করা এবং নিজের বৈধ অবস্থানের শর্ত মেনে চলা ভিসাধারীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

ভ্রমণের উদ্দেশ্য পরিবর্তন হলে কী করবেন?

বাস্তব জীবনে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে। কেউ পর্যটনে গিয়ে কোনো নতুন সুযোগ পেতে পারেন, কেউ আত্মীয়ের মাধ্যমে চাকরির প্রস্তাব পেতে পারেন, আবার কেউ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেতে পারেন।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ভুল হবে—ভিজিটর ভিসার সুযোগ নিয়ে সরাসরি সেই কর্মকাণ্ড শুরু করে দেওয়া। বরং সংশ্লিষ্ট ভিসা বা স্ট্যাটাসের নিয়ম কী, সেটি আগে যাচাই করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপযুক্ত অনুমতি নিতে হবে।

নিজের পাশাপাশি অন্যকেও সতর্ক করুন

বাংলাদেশিদের আরেকটি দায়িত্ব হলো, ভিসা নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা। ‘ভিজিটর ভিসায় গিয়ে কাজ করা যায়’, ‘কাজ শুরু করলে পরে কাগজ হয়ে যাবে’, ‘সন্তান জন্ম দিলেই নাগরিকত্ব নিশ্চিত’—এ ধরনের কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পরিচিতজনের পরামর্শের পরিবর্তে আমেরিকার সরকারি সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি। কারণ ইমিগ্রেশন আইন ও নীতিমালা পরিবর্তিত হতে পারে এবং এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অন্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

ভিসা পাওয়া শেষ কথা নয়

আমেরিকার ভিজিটর ভিসা পাওয়া যেমন একটি অর্জন, তেমনি এটি একটি দায়িত্বও। একজন ভিসাধারী যত বেশি নিয়ম মেনে চলবেন, ভবিষ্যতে তার ভ্রমণ ইতিহাস তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য থাকবে।

তাই ভিসা হাতে পাওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় মনে রাখা দরকার—ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য বজায় রাখা, ভিসার অনুমোদিত কার্যক্রমের বাইরে না যাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমেরিকা ত্যাগ করা।

আমেরিকায় ভ্রমণের সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে নিয়ম জানা এবং নিয়ম মানার বিকল্প নেই। একটি ভিসা দিয়ে সাময়িক সুবিধা নেওয়ার চেয়ে ভবিষ্যতের ভ্রমণ ও ভিসার সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকান দূতাবাস ঢাকার সাম্প্রতিক সতর্কবার্তাটি তাই শুধু নতুন ভিসা আবেদনকারীদের জন্য নয়; যাঁরা ইতিমধ্যে B1/B2 ভিজিটর ভিসা পেয়েছেন, তাঁদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা—ভিসা পেয়েছেন, এবার দায়িত্বশীলভাবে তা ব্যবহার করুন।

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা