মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে ধাক্কা, আশঙ্কাজনক হারে কমছে জনশক্তি রপ্তানি, করণীয় কি?

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ২:২৯ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৭, ২০২৬

পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাতে যারা বাংলাদেশ ছেড়েছেন, তাদের ঘামেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের জন্য, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ভালো না থাকলে কি ভালো থাকতে পারবে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসের পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগের নয়, বরং একটি বড় সতর্কবার্তা। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ১৭ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিদেশে গেছেন ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৭ জন কর্মী; শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ৫০.৮৭%। ২০২৫ সালের একই সময়ে ৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৩৮ জনের তুলনায় ২০২৬ সালে ৩৮.৫৩ শতাংশ কম রেমিট্যান্স যোদ্ধা বিদেশে গেছেন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে সৌদি আরবকে ঘিরে। ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৭ বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজের জন্য গিয়েছিলেন, যা মোট বিদেশগামী কর্মীর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি-আগস্ট সময়ে সৌদিতে গেছেন ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৬ জন। অর্থাৎ বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো একটি দেশের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল।

এই পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রভাবও বড়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ রেকর্ড ৩২.৮১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছে। আর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স আরও বেড়ে প্রায় ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—যা একটি অর্থবছরে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, আমদানি ব্যয় ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার হার দীর্ঘদিন কমে গেলে কয়েক বছর পর তার সরাসরি প্রভাব রেমিট্যান্স প্রবাহে পড়তে পারে।

তবে সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনাও আছে। ইউরোপে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশিদের বৈধ শ্রম অভিবাসন ৪৬.৪ শতাংশ বেড়ে ১৮,২২০ জনে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কর্মীর কর্মসংস্থান ইউরোপে হলেও মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৯.৬ শতাংশ এসেছে ইউরোপ থেকে। অর্থাৎ কম সংখ্যক কর্মী থেকেও তুলনামূলক বেশি রেমিট্যান্স পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জাপানও সম্ভাবনাময় বাজার। ২০২৫ সালে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি জাপানে চাকরির ভিসা বা সংশ্লিষ্ট পথে গেছেন, যেখানে ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ৩,৫৭৪। তাই বাংলাদেশের এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ “বেশি মানুষ পাঠানো” নয়, “বেশি দেশে, বেশি দক্ষ মানুষ পাঠানো”।

সরকারকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি, পর্তুগাল, রোমানিয়া, পোল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও অন্যান্য শ্রমঘাটতিসম্পন্ন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শ্রমবাজার কূটনীতি জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নির্মাণ ও সাধারণ শ্রমের বাইরে নার্সিং, কেয়ারগিভিং, আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, হসপিটালিটি, কৃষি-প্রযুক্তি ও টেকনিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে এখন একটি “সৌদি-নির্ভর স্বল্পদক্ষ শ্রমিকভিত্তিক অভিবাসন মডেল” থেকে “বহু দেশ ও বিভিন্ন খাতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর অভিবাসন মডেল”-এ রূপান্তর করতে হবে। কারণ বিদেশে কর্মসংস্থান শুধু চাকরির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ পরিবারের আয়, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আজকের পতনকে যদি সতর্ক সংকেত হিসেবে না দেখা হয়, আগামী দিনের রেমিট্যান্স প্রবাহে তার মূল্য দিতে হতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন একটাই প্রশ্ন—আমরা কি কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভর করব, নাকি দক্ষ জনশক্তি নিয়ে বিশ্বের বহু শ্রমবাজারের দরজা খুলব?

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি

সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা