আমেরিকা থেকে ৯ লাখ ৮০ হাজার অভিবাসী বহিষ্কার
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫:২৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম ১৮ মাসে দেশটি থেকে প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বছরে ১০ লাখ মানুষকে বহিষ্কারের যে লক্ষ্য তাঁর প্রশাসন ঘোষণা করেছিল, তা পূরণ হয়নি। আমেরিকার অভিবাসননীতি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের (এমপিআই) এক নতুন বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে এ হিসাব তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে আমেরিকা থেকে আনুমানিক ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষকে বহিষ্কার করা হয়। ২০২৬ অর্থবছরে এ সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এমপিআই। এ হিসাব বাস্তবায়িত হলে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময়কার বার্ষিক গড়ের তুলনায় বহিষ্কারের সংখ্যা ২৬ শতাংশ বেশি হবে। তবে সংখ্যা বাড়লেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তা কম।
সীমান্তের পাশাপাশি দেশের ভেতরেও অভিযান
এমপিআইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বহিষ্কৃতদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি প্রথমে আমেরিকার সীমান্ত এলাকায় আটক বা শনাক্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার জনকে সীমান্তে আটক করার পর ফেরত পাঠানো হয়। একই সংখ্যক মানুষকে প্রথমে সীমান্তে আটক করার পর অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই) বহিষ্কার করে। বাকি প্রায় ৩ লাখ মানুষকে আমেরিকার অভ্যন্তর থেকে আটক করে বহিষ্কার করা হয়েছে।
দেশের ভেতর থেকে আটক ব্যক্তিদের বহিষ্কারের হারও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। এমপিআইয়ের হিসাবে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট বহিষ্কারের ২৮ শতাংশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আমেরিকার অভ্যন্তর থেকে আটক করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এ হার বেড়ে ৩৪ শতাংশে দাঁড়ায়। জুলাইয়ে তা আরও বেড়ে ৩৯ শতাংশ হয়।
একই সময়ে দেশের ভেতর থেকে আটক ব্যক্তিদের বহিষ্কারের মাসিক গড়ও বেড়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এ সংখ্যা ছিল মাসে প্রায় ৮ হাজার। মে থেকে জুলাইয়ে তা বেড়ে প্রায় ১৯ হাজারে পৌঁছায়।
বহিষ্কৃতদের বড় অংশের অপরাধে দণ্ডের রেকর্ড নেই
প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, বহিষ্কৃত অভিবাসীদের বড় অংশের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড ছিল না। এমপিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৮ মাসে মোট বহিষ্কারের প্রায় ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড পাওয়া গেছে।
আমেরিকায় অন্তত দুই বছর বসবাসের পর যাঁরা বহিষ্কৃত হয়েছেন, তাঁদের ৭১ শতাংশের কোনো ফৌজদারি দণ্ডের রেকর্ড ছিল না। আর অন্তত ১০ বছর ধরে দেশটিতে বসবাস করা বহিষ্কৃতদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকায় বসবাস করা অনেক অভিবাসীও বহিষ্কার অভিযানের আওতায় পড়েছেন।
সরকারি তথ্যের সীমাবদ্ধতা
এমপিআইয়ের অভিবাসনবিষয়ক গবেষক মার্ক নোলেনব্লাম এ বিশ্লেষণ তৈরি করেছেন। এতে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া নথি এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
আমেরিকার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর থেকে অভিবাসনবিষয়ক বিস্তারিত মাসিক পরিসংখ্যান প্রকাশ সীমিত করায় বহিষ্কারের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে গবেষকদের বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে হিসাব করতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে ৩০ লাখের বেশি অনথিভুক্ত অভিবাসী আমেরিকা ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ২২ লাখ স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করেছেন বলে প্রশাসনের হিসাব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে নিউজউইককে জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ মানুষকে বহিষ্কার এবং আরও ১১ লাখের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সরকারি এ হিসাবের সময়সীমা এমপিআইয়ের বিশ্লেষণের চেয়ে দীর্ঘ। এ ছাড়া স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের দাবির পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
বহিষ্কারের পথে যেসব বাধা
ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে। অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণে এ অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বহিষ্কারের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, অভিবাসন আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জটিলতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
আমেরিকায় বসবাসরত অভিবাসীদের উৎসদেশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কিছু দেশের সঙ্গে প্রত্যাবাসন নিয়ে সমন্বয় করাও কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি আটক ও বহিষ্কারসংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে আদালতে একাধিক মামলা চলছে।
এমপিআইয়ের আমেরিকা অভিবাসননীতি কর্মসূচির পরিচালক ডরি মাইসনার বলেন, অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার বাড়াতে যখন বিপুল অর্থ ও নীতিগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন অভিবাসন কার্যক্রমের প্রকৃত প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে এ বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০০০ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে আমেরিকা থেকে প্রায় ১৮ লাখ ৬০ হাজার বহিষ্কারের যে রেকর্ড ছিল, বর্তমান সংখ্যা তার তুলনায় অনেক কম।
সূত্র: মাইগ্রেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ ও নিউজউইক।



