ডিভি লটারিতে বাংলাদেশ: অনিশ্চয়তার অবসান জরুরি
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ৪:৫৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
আমেরিকার ডাইভারসিটি ভিসা (ডিভি) লটারি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে উন্নত জীবনের স্বপ্নপূরণের একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকায় বহু বছর ধরেই হতাশা রয়েছে। সামনে ২০২৭ অর্থবছরের ডিভি লটারি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও বাংলাদেশিদের আবেদনের সুযোগ থাকবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কেন এই সুযোগের বাইরে, আর ভবিষ্যতে আবারও কি বাংলাদেশিরা ডিভি লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন?
আমেরিকার ডিভি লটারি কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো, যেসব দেশ থেকে ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কমসংখ্যক মানুষ আমেরিকায় অভিবাসন করেছেন, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসনের একটি সুযোগ তৈরি করা। অর্থাৎ, কোনো দেশের নাগরিকদের অভিবাসনের হার বেশি হলে সেই দেশকে নির্দিষ্ট বছরের কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত ডিভি-২০২৬ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অযোগ্য দেশের তালিকায় ছিল। ফলে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী অনেক আগ্রহী ব্যক্তি এই কর্মসূচিতে আবেদন করার সুযোগ পাননি।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—ডিভি লটারিতে যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণত আবেদনকারীর নাগরিকত্ব নয়, বরং জন্মদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলেই বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদনের যোগ্য হয়ে যান না। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর জন্মদেশ কিংবা বাবা-মায়ের জন্মদেশের ভিত্তিতে যোগ্যতা নির্ধারণের সুযোগ থাকতে পারে। ফলে বিষয়টি বুঝতে হলে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি নির্দেশনা ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ আবার ফিরবে কি না। এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, কোন দেশ যোগ্য হবে, তা নির্ধারণ করা হয় সংশ্লিষ্ট সময়ের অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য ও প্রযোজ্য বিধানের ভিত্তিতে। তাই বাংলাদেশ একবার অযোগ্য তালিকায় থাকলেই ভবিষ্যতেও চিরস্থায়ীভাবে বাদ থাকবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি আগামী বছরই সুযোগ ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ছড়ানোও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
২০২৭ অর্থবছরের ডিভি লটারি নিয়ে নতুন করে আলোচনার কারণ হচ্ছে, কর্মসূচির নিবন্ধন শুরু করার বিষয়ে আদালতের নির্দেশের খবর। কিন্তু নিবন্ধন চালুর নির্দেশ এবং বাংলাদেশিদের আবেদনের যোগ্যতা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আদালতের নির্দেশে আবেদনপ্রক্রিয়া চালু হলেও তাতে বাংলাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্য দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে না। তাই নিবন্ধনের সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে আগ্রহের পাশাপাশি যোগ্য দেশের তালিকা প্রকাশের অপেক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আবেদনপ্রত্যাশীদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ভুল তথ্য ও প্রতারণার শিকার হওয়া। ডিভি লটারিতে আবেদন, নির্বাচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত অভিবাসী ভিসা পাওয়া—তিনটি পৃথক ধাপ। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে আবেদন নিশ্চিত করা, লটারিতে নির্বাচিত করে দেওয়া কিংবা গ্রিন কার্ড পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারে না। এ ধরনের দাবি থেকে সতর্ক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আবেদনপ্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট, ফি বা অন্যান্য শর্তসংক্রান্ত পরিবর্তন এলে তা কেবল সরকারি নির্দেশনা থেকেই নিশ্চিত হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। ডিভি লটারিতে অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরে আসবে কি না, তা নিয়ে সরকারের পক্ষে নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব না হলেও আমেরিকার অভিবাসননীতি, যোগ্যতার শর্ত এবং বাংলাদেশিদের অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকলে প্রযোজ্য বিধান ও ভবিষ্যৎ যোগ্যতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেওয়ার উদ্যোগও সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, আশা ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা। ডিভি লটারি কোনো দেশের সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত নয়; আবার কোনো দেশের নাগরিকেরা একবার বাদ পড়লে ভবিষ্যতেও তাঁদের জন্য সুযোগ বন্ধ থাকবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। বাংলাদেশিদের জন্য ২০২৭ সালের কর্মসূচিতে আবেদনের সুযোগ থাকবে কি না, তা জানতে সরকারি ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পরবর্তী বছরগুলোতেও যোগ্যতার তালিকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
অভিবাসনের স্বপ্ন দেখা দোষের নয়। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভিত্তি হতে হবে সঠিক তথ্য, বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা ও সরকারি নিয়মের প্রতি আস্থা। বাংলাদেশিদের জন্য ডিভি লটারির দরজা আবার খুলবে কি না, তার উত্তর এখনো অজানা। এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে অনুমাননির্ভর প্রচারণা নয়, প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নির্দেশনা।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা



