বাংলাদেশের পাসপোর্ট এত দুর্বল কেন? কোথায় আমাদের ব্যর্থতা?

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৭:০৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

বাংলাদেশের পাসপোর্ট এত দুর্বল কেন?

মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে থাকা এমন অনেক দেশ আছে, যাদের পাসপোর্ট বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। অর্থাৎ, একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আর তার পাসপোর্টের শক্তির মধ্যে সরাসরি এবং একমাত্র সম্পর্ক নেই। এপ্রিল ২০২৬-এ আইএমএফ-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি, $২,৯১১ মার্কিন ডলার। সাম্প্রতিক হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান বিশ্বে ৯৮তম এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট-এর স্কোর ৩৫। অর্থাৎ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৫টি দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়ে, যেমন ভিসা ফ্রি, ভিসা অন অ্যারাইভাল বা অনুরূপ সুবিধার মাধ্যমে প্রবেশ ও ভ্রমণের সুযোগ পান। অন্যদিকে উগান্ডার মাথাপিছু জিডিপি $১,৪৭৬ মার্কিন ডলার আর পাসপোর্টের অবস্থান ৭৩তম, স্কোর ৬৫। অর্থাৎ বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম মাথাপিছু আয়ের দেশ উগান্ডার পাসপোর্ট মোবিলিটি বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ।

 

হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স কিভাবে কাজ করে?

হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স কোনো দেশের অর্থনীতি, সামরিক শক্তি বা জীবনযাত্রার মান দিয়ে পাসপোর্ট র‍্যাংকিং করে না। এটি মূলত একটি দেশের একজন সাধারণ পাসপোর্টধারী কতগুলো দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়ে যেতে পারেন, সেই ভ্রমণ স্বাধীনতা পরিমাপ করে। ২০২৬ সালের ইনডেক্স-এ ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট এবং ২২৭টি ভ্রমণ গন্তব্যকে বিবেচনা করা হয়েছে। এখানে ভিসা ফ্রি প্রবেশ এর পাশাপাশি ভিসা অন অ্যারাইভাল, ভিজিটর পারমিট এবং ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথোরাইজেশন বা ইটিএ-ও নির্দিষ্ট শর্তে গণনায় আসে। তবে আগে থেকে কোনো দেশের সরকার অনুমোদিত ই-ভিসা প্রয়োজন হলে সেটি সাধারণত ভিসা ফ্রি প্রবেশাধিকার হিসেবে গণনা করা হয় না।

২০০৬ সালে হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স শুরু হওয়ার সময় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৬৮তম। ২০ বছর পর আজ আমরা ৯৮তম অবস্থানে। অর্থাৎ, দুই দশকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০ ধাপ পিছিয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের গড় পাসপোর্টের মোবিলিটি কিন্তু অনেক বেড়েছে। ২০০৬ সালে একটি সাধারণ পাসপোর্ট গড়ে ৫৮টি দেশে ভিসা ফ্রি সুবিধা পেত; ২০২৬ সালে সেই বৈশ্বিক গড় বেড়ে হয়েছে ১০৮টি দেশ। পৃথিবীর অনেক দেশ গত ২০ বছরে তাদের নাগরিকদের ভ্রমণ স্বাধীনতা বাড়াতে পেরেছে; বাংলাদেশ সেই গতিতে এগোতে পারেনি, বরং পিছিয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের পাসপোর্ট কেন সেই অগ্রগতির প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না?

 

কিভাবে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল মালয়েশিয়া? 

মালয়েশিয়ার দিকে তাকালে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে যায়। মালয়েশিয়া স্বাধীন হয়েছে ১৯৫৭ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র ১৪ বছর আগে। ১৯৮০ ও ১৯৯০ এর দশকে মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আসতেন মেডিক্যাল কলেজে পড়তে; কয়েক বছর আগেও আসতেন, যদিও সংখ্যায় খুব কম। আজ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। এডুকেশন মালয়েশিয়া গ্লোবাল সার্ভিসেস বা ইএমজিএস (Education Malaysia Global Services বা EMGS) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৬,১০৩ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়তে গিয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্কের চরিত্র বদলেছে। আর পাসপোর্ট মোবিলিটি-এর ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বড়। জুলাই ২০২৬-এর হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স-এ মালয়েশিয়ার পাসপোর্ট ৭ম অবস্থানে, স্কোর ১৮৩। অর্থাৎ মালয়েশিয়ার পাসপোর্টধারীদের জন্য ১৮৩টি দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়ে ভ্রমণের সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের স্কোর ৩৫ আর মালয়েশিয়ার ১৮৩। এই ব্যবধান শুধু মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নতির গল্প নয়। এটি আন্তর্জাতিক আস্থা, কূটনীতি, শিক্ষা, বাণিজ্য, পর্যটন, যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক নীতি কৌশল-এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যর্থতার গল্পও বটে।

বাংলাদেশের পাসপোর্টে ৩৫টি দেশ   

সাম্প্রতিক হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৫টি দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়ে ভ্রমণের সুবিধা পান। এই তালিকায় রয়েছে আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান, প্যাসিফিক এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি ভ্রমণযোগ্য কয়েকটি দেশ হল— নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও ক্যাম্বোডিয়া। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে যে, বাস্তবিকভাবে প্রতিটি দেশ একজন বাংলাদেশী পর্যটকের জন্য সমানভাবে সুবিধাজনক নয়। অনেকগুলো দেশের সাথে সরাসরি বিমান যোগাযোগ নেই। কোনো কোনো দেশে ভ্রমণের খরচ অনেক বেশি। কয়েকটি দেশে প্রবেশের শর্ত বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা কঠিন হতে পারে। তাই পাসপোর্টের শক্তি শুধু একটি সংখ্যা দিয়ে বিচার করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। ৩৫টি দেশ থাকা আর ৩৫টি দেশ বাস্তবে সহজেই ভ্রমণ করতে পারা, এক কথা নয়।

বাংলাদেশের চেয়ে দুর্বল পাসপোর্ট কোন দেশগুলোর?   

সাম্প্রতিক হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বে বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান ৯৮তম, স্কোর ৩৫, অর্থাৎ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা ৩৫টি দেশে আগে থেকে ভিসা না নিয়ে, যেমন ভিসা ফ্রি, ভিসা অন অ্যারাইভাল বা অনুরূপ সুবিধার মাধ্যমে প্রবেশ ও ভ্রমণের সুযোগ পান। বাংলাদেশের সাথে ৯৮তম অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, স্কোর ৩৫।

অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে দুর্বল হলেও পাসপোর্টে শক্তিশালী

২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি, $২,৯১১ মার্কিন ডলার। সাম্প্রতিক হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স-এ বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান বিশ্বে ৯৮তম এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিয়ে ৩৫টি দেশে ভিসা ফ্রি, ভিসা অন অ্যারাইভাল বা অনুরূপ সুবিধার মাধ্যমে প্রবেশ ও ভ্রমণের সুযোগ আছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, অনেকগুলো দেশ অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে বেশ দুর্বল হলেও, পাসপোর্টের শক্তির দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে আছে। উদাহরণস্বরূপ, পাপুয়া নিউ গিনি, পাসপোর্টের অবস্থান বিশ্বে ৬০তম, ৮৪টি দেশে ভিসা ফ্রি, ভিসা অন অ্যারাইভাল বা অনুরূপ সুবিধার মাধ্যমে প্রবেশ ও ভ্রমণের সুযোগ আছে, মাথাপিছু জিডিপি $২,৬৩২।

 

 

ওয়েইভার নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করতে হবে।

· বাংলাদেশের দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনস্যুলেটকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বৈধ ও সহজ আন্তর্জাতিক চলাচলের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

· রিক্রুটিং এজেন্সি ও ট্রাভেল এজেন্সিকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। ভুয়া চাকরি, জাল কাগজপত্র, অবৈধ অভিবাসন বা ভুয়া ভিসার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে উৎসাহিত করতে হবে।

· নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। ভিসা আবেদনে সত্য তথ্য দিতে হবে, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করা যাবে না, বিদেশে গিয়ে স্থানীয় আইন মেনে চলতে হবে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দেশে ফিরতে হবে।

· সরকারকে অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে। রপ্তানি ও বৈদেশিক বিনিয়োগের লক্ষ্য যেভাবে নির্ধারণ করা হয়, তেমনি আগামী এক, তিন, পাঁচ ও দশ বছরে কতগুলো নতুন দেশে বাংলাদেশি পাসপোর্টে ভ্রমণ ও প্রবেশ সুবিধা বাড়ানো হবে, তারও জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশের পাসপোর্ট দুর্বল হওয়া শুধু বিদেশ ভ্রমণের সমস্যা নয়। এটি শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক সুযোগের সাথেও জড়িত। বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, মানুষের মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি চাকরি, ব্যবসা, ও পড়াশোনা করছেন। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, এই অগ্রগতির প্রতিফলন আমাদের পাসপোর্টে কেন হয়নি?

শক্তিশালী পাসপোর্ট এর জন্য দরকার আন্তর্জাতিক আস্থা, কার্যকর কূটনীতি, দায়িত্বশীল নাগরিক, সৎ ও জবাবদিহিমূলক ভিসা-রিক্রুটিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। শক্তিশালী পাসপোর্ট শুধু একটি ভ্রমণ নথি নয়, এটি একটি দেশের প্রতি বিশ্বের আস্থার প্রতিফলন। সেই আস্থা কি অর্জন করতে পারবে বাংলাদেশ? কবে?

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি

সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা