দেশে এসেছে প্রায় ৮০০ মরদেহ

মধ্যপ্রাচ্যে অনিরাপদ প্রবাসী নারী কর্মীরা

সাত বছরে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফিরেছেন ৮০ হাজার

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অনেক নারী অভিবাসী শ্রমিকের জীবন এখনো নানা ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত নারীদের একটি বড় অংশ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, বেতন বঞ্চনা এবং শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রায় ৮০ হাজার বাংলাদেশি নারী দেশে ফিরেছেন। একই সময়ে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এসব মৃত্যুর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’, ‘হার্ট অ্যাটাক’ বা ‘আত্মহত্যা’র কথা উল্লেখ করা হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, অনেক ঘটনার পেছনে নির্যাতন বা রহস্যজনক পরিস্থিতি রয়েছে, যা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং পারিবারিক দায়-দায়িত্বের কারণে অনেক নারী বিদেশে কাজ করতে বাধ্য হন। স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হওয়ায় তারা উন্নত আয়ের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দালালচক্র তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠায়। বাস্তবে প্রতিশ্রুত চাকরি, বেতন ও কর্মপরিবেশের সঙ্গে মিল না থাকায় তারা বিপদের মুখে পড়েন।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী নারী কর্মীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে বিদেশে গেছেন। অনেককে বিনা খরচে পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও পরে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায় করা হয়।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে প্রচলিত ‘কাফালা’ পদ্ধতি নারী গৃহকর্মীদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। এই ব্যবস্থায় নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া কর্মী চাকরি পরিবর্তন বা দেশে ফিরতে পারেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘ সময় কাজ, বেতন আটকে রাখা, পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া, শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো পরিস্থিতির শিকার হন। কিছু ঘটনায় জোরপূর্বক যৌন শোষণের অভিযোগও উঠে এসেছে।

এদিকে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস পরিচালিত সেফ হোমগুলোতে নির্যাতনের শিকার নারী কর্মীদের সংখ্যা নিয়মিত বাড়ছে। তবে ধারণক্ষমতার তুলনায় আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তাদের নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা এবং দ্রুত দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ফিরে আসার পরও অনেক নারী নতুন সংকটে পড়েন। সামাজিক কুসংস্কার, পারিবারিক অবহেলা এবং মানসিক ট্রমার কারণে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিদেশে নির্যাতনের পাশাপাশি দেশে ফিরে সামাজিক ও মানসিক সংকটও মোকাবিলা করতে হয়।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদেশে যাওয়ার আগে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি, দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, দূতাবাসের সেবা আরও শক্তিশালী করা এবং গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশে ফিরে আসা নির্যাতিত নারী কর্মীদের পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।