তালিকায় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানও

নারীদের উচ্চশিক্ষায় বিশ্বের আলোচিত ১২ বিশ্ববিদ্যালয়

সানজিদা হক প্রমা

সানজিদা হক প্রমা

প্রকাশিত: ৬:২৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১২, ২০২৬

নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি ও নেতৃত্বের বিকাশে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে নারী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো। একসময় উচ্চশিক্ষা মূলত পুরুষদের জন্য সীমিত থাকলেও বর্তমানে নারীরা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ। তবে নারী শিক্ষার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা বিভিন্ন দেশে ধীরে ধীরে কমছে।

স্টাডি ইন্টারন্যাশনালের ২০ জুলাই ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য নারী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর তালিকা তুলে ধরা হয়েছে। তালিকায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, আমেরিকা, সৌদি আরব, ভারত ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মূল প্রতিবেদনের শিরোনামে ১০টি প্রতিষ্ঠান বলা হলেও বিস্তারিত তালিকায় মোট ১২টি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

১. জাপান উইমেনস ইউনিভার্সিটি

১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপান উইমেনস ইউনিভার্সিটি দেশটির সবচেয়ে পুরোনো ও বড় বেসরকারি নারী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, ব্যক্তিসত্তা ও নিজস্ব সম্ভাবনার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

বিশ্ববিদ্যালয়টির দুটি ক্যাম্পাস রয়েছে—টোকিওর মেইজিরোদাই এবং কানাগাওয়া প্রিফেকচারের তামা এলাকার নিশি-ইকুটা।

উল্লেখযোগ্য সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মাঙ্গা শিল্পী রুমিকো তাকাহাশি এবং স্থপতি কাজুও সেজিমা। সেজিমা ২০১০ সালে রিউ নিশিজাওয়ার সঙ্গে যৌথভাবে স্থাপত্যের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রিটজকার পুরস্কার পান।

২. সিউল উইমেনস ইউনিভার্সিটি

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল উইমেনস ইউনিভার্সিটির যাত্রা শুরু হয় ১৯২৩ সালে। তবে ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে এর কার্যক্রম শুরুতে বাধার মুখে পড়ে। ১৯৬০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার পর ১৯৬১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

এখানে ব্যবসা, নকশা, ফ্যাশন, শিল্প, কোরিয়ান স্টাডিজ, তথ্যবিজ্ঞান, খাদ্য ও পুষ্টি এবং অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।

৩. টোকিও উইমেনস মেডিকেল ইউনিভার্সিটি

নারীদের চিকিৎসাশিক্ষায় এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে জাপানি চিকিৎসক ও নারী অধিকারকর্মী ইয়োশিওকা ইয়ায়োই ১৯০০ সালে টোকিও উইমেনস মেডিকেল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেন।

এটি জাপানের নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রথম মেডিকেল স্কুল এবং দেশটির একমাত্র নারী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে মেডিসিন ও নার্সিং—দুটি প্রধান স্কুল রয়েছে।

মেডিসিনে ফার্মাকোলজি, ফরেনসিক মেডিসিন, চর্মরোগ, হৃদ্‌যন্ত্রের অস্ত্রোপচার, স্ত্রীরোগ ও ক্যানসার চিকিৎসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষায়িত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

৪. নিউনহ্যাম কলেজ

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নিউনহ্যাম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭১ সালে। সেই সময়ে কেমব্রিজে নারীদের পড়াশোনার সুযোগ ছিল না। নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে হেনরি সিডগউইক ও ডেম মিলিসেন্ট গ্যারেট ফসেটের উদ্যোগে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে এখানে প্রত্নতত্ত্ব, স্থাপত্য, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, পশুচিকিৎসা ও সংগীতসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।

এই প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেত্রী ও লেখক এমা থম্পসন, প্রাণিবিজ্ঞানী জেন গুডল, কবি সিলভিয়া প্লাথ এবং জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল ডেম মার্গারেট অ্যানস্টি।

৫. ওয়েলেসলি কলেজ

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ওয়েলেসলি কলেজ একটি মর্যাদাপূর্ণ বেসরকারি উদার শিল্পভিত্তিক নারী কলেজ।

১৮৭০ সালে পলিন ও হেনরি ফাউল ডুরান্ট এটি প্রতিষ্ঠা করেন। নারীদের নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করা এবং সমাজে অর্থবহ পরিবর্তন আনার দক্ষতা তৈরিই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।

এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইট, নাসার সাবেক নভোচারী পামেলা মেলরয় এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।

৬. ইহওয়া উইমেন্স ইউনিভার্সিটি

দক্ষিণ কোরিয়ার ইহওয়া উইমেন্স ইউনিভার্সিটির ইতিহাস শুরু হয় ১৮৮৬ সালে। আমেরিকান মিশনারি মেরি স্ক্র্যানট সিউলে নিজের বাড়িতে নারীদের একটি ছোট শ্রেণিতে পাঠদান শুরু করেছিলেন। সেই উদ্যোগ থেকেই পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ইহওয়া।

বর্তমানে এটি দক্ষিণ কোরিয়ার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী, ১১টি কলেজ, ১৫টি স্নাতকোত্তর স্কুল ও ৬৬টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে।

পেশাদার গলফার গ্রেস পার্ক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক শিক্ষা মন্ত্রী ও প্রথম নারী উপপ্রধানমন্ত্রী ইউ ইউন-হে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সাবেক শিক্ষার্থী।

৭. প্রিন্সেস নুরাহ বিনতে আবদুর রহমান ইউনিভার্সিটি

সৌদি আরবে নারীদের উচ্চশিক্ষার বিস্তারের অন্যতম বড় উদাহরণ প্রিন্সেস নুরাহ বিনতে আবদুর রহমান ইউনিভার্সিটি।

১৯৭০ সালে নারীদের জন্য প্রথম শিক্ষা কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা পরে ১০২টি কলেজের একটি বড় নেটওয়ার্কে পরিণত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান ৭২টি শহরে ছড়িয়ে রয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক নারী শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিচ্ছে।

সৌদি আরবের দ্বিতীয় নারী রাষ্ট্রদূত আমাল ইয়াহইয়া আল-মোয়াল্লেমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বর্তমানে নরওয়েতে সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

৮. ডুকসুং উইমেন্স ইউনিভার্সিটি

দক্ষিণ কোরিয়ার ডুকসুং উইমেন্স ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালে। নারী অধিকারকর্মী চা মিরিসার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।

দুটি ক্যাম্পাসে ৩৯টি স্নাতক পর্যায়ের বিষয় এবং ২২টি স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম রয়েছে।

কোরিয়ান ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করা লেখক চোই জিন-ইয়ং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সাবেক শিক্ষার্থীদের একজন।

৯. বানাস্থলী বিদ্যাপীঠ

ভারতের রাজস্থানে অবস্থিত বানাস্থলী বিদ্যাপীঠ একটি বেসরকারি নারী বিশ্ববিদ্যালয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসিক নারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত।

৮৫০ একরজুড়ে বিস্তৃত ক্যাম্পাসে প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এখানে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ছাড়াও ১৮টি স্নাতক, ৬১টি স্নাতকোত্তর এবং ৩২টি ডক্টরাল প্রোগ্রাম রয়েছে।

ক্যাম্পাসে ২৯টি আবাসিক হোস্টেল, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, ক্রীড়া সুবিধা ও কমিউনিটি রেডিও রয়েছে। এমনকি নারীদের বিমান চালনা ও দিকনির্দেশনা প্রশিক্ষণের জন্য একটি অনুমোদিত বিমানপথও রয়েছে।

ভারতের প্রথম নারী যুদ্ধবিমান চালক অবনী চতুর্বেদী এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী।

১০. স্মিথ কলেজ

আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের নর্থহ্যাম্পটনে অবস্থিত স্মিথ কলেজ ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি মর্যাদাপূর্ণ উদার শিল্পভিত্তিক নারী কলেজ।

প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষার ইতিহাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত। ১৮৯২ সালে এখানে প্রথম নারী বাস্কেটবল কর্মসূচি চালু হয়। ২০০০ সালে এটি প্রথম নারী কলেজ হিসেবে প্রকৌশল বিষয়ে ডিগ্রি চালু করে।

বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে শিক্ষার্থীরা আসেন। ৮৩টি বিষয়ে ১ হাজার ২০০টির বেশি কোর্স রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষার পথ তৈরি করতে পারেন। এছাড়া ১৪০টির বেশি শিক্ষার্থী সংগঠন রয়েছে।

আমেরিকার বিখ্যাত রাঁধুনি ও লেখক জুলিয়া চাইল্ড এই কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী।

১১. এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন

বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অবস্থিত এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন বা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন—বিশ্বের নারী শিক্ষার আলোচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকায় রয়েছে।

২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের সংসদ কর্তৃক একটি স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনুমোদিত। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়াই এর অন্যতম লক্ষ্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ১৩০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। বর্তমানে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং এশিয়ান স্টাডিজসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরিবারের প্রথম প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। পাশাপাশি শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর তরুণীদেরও মেধার ভিত্তিতে পড়ার সুযোগ দেওয়া হয়।

১২. উইমেন্স ইউনিভার্সিটি ইন আফ্রিকা

জিম্বাবুয়ের মারোন্দেরায় ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত উইমেন্স ইউনিভার্সিটি ইন আফ্রিকা আফ্রিকা মহাদেশের নারী-কেন্দ্রিক উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রথম প্রতিষ্ঠান।

প্রফেসর হোপ সাদজা ও জিম্বাবুয়ের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ফে চুং প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতি কমানো ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।

তবে এটি পুরোপুরি নারী বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এখানে প্রায় ৮০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারেন। ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোক্তা বিজ্ঞান এবং সামাজিক ও লিঙ্গ রূপান্তরমূলক বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।

নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ কেন অনিশ্চিত

বিশ্বে নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা একসময় অনেক বেশি থাকলেও বর্তমানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়া, আর্থিক চাপ ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে সমস্যায় পড়েছে।

জাপানে নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। দেশটির চার বছর মেয়াদি প্রায় ৮০০টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ নারী বিশ্ববিদ্যালয়। তবে গত দুই দশকে দেশটিতে সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে। প্রায় প্রতি বছরই একটি করে নারী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হচ্ছে বা সহশিক্ষা ব্যবস্থায় চলে যাচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে কোবে শিনওয়া উইমেন্স ইউনিভার্সিটি সহশিক্ষা ব্যবস্থায় চলে গিয়ে নতুন নামে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ডংদুক উইমেন্স ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা সহশিক্ষা ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন করেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে শত শত শিক্ষার্থী বিক্ষোভে অংশ নেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশও ক্যাম্পাসে যায়।

শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, নারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নারীদের এমন একটি নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ দেয়, যেখানে তারা সামাজিক পক্ষপাত ও বৈষম্যের চাপ ছাড়াই নিজেদের মতামত, আগ্রহ ও নেতৃত্বের দক্ষতা বিকশিত করতে পারেন।

নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুবিধা কী

নারী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকরা উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার ক্ষেত্রে এবং ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ-প্রধান বিষয়গুলোতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি আগ্রহী—এমন তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

উইমেনস কলেজ কোয়ালিশনের সংকলিত গবেষণা অনুযায়ী, নারী কলেজের শিক্ষার্থীরা সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তুলনায় স্নাতক সম্পন্ন করা, উচ্চশিক্ষায় যাওয়া এবং পুরুষ-প্রধান বিষয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহ দেখান।

তবে এসব তথ্যকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। কারণ নারী কলেজে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই হয়তো উচ্চশিক্ষা ও নির্দিষ্ট ক্যারিয়ারের বিষয়ে বেশি আগ্রহী থাকেন। অর্থাৎ সাফল্যের পেছনে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের—দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নীতি এক নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান নন-বাইনারি, ট্রান্সজেন্ডার ও অন্যান্য লিঙ্গপরিচয়ের শিক্ষার্থীদেরও ভর্তি করে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নারী-কেন্দ্রিক হলেও সীমিতসংখ্যক পুরুষ শিক্ষার্থী ভর্তি করে। তাই ভর্তির আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ ভর্তি নীতি ও যোগ্যতার শর্ত যাচাই করা জরুরি।

নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস

নারীদের জন্য আলাদা উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান তৈরির ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৮৩৬ সালে আমেরিকার জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ওয়েসলিয়ান কলেজ বিশ্বের প্রথম নারী কলেজ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি করে।

শুরুতে মাত্র ৯০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেন। কলা, চারুকলা ও নার্সিংয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, আইন, চিকিৎসা ও ফার্মেসিসহ বিভিন্ন পেশাভিত্তিক প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচিও রয়েছে।

তবে সময়ের সঙ্গে সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাভাবিক রূপ নেওয়ায় নারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অস্তিত্ব নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

২০১৮ সালে জাপানের একটি সরকারি তদন্তে দেখা যায়, অন্তত নয়টি মেডিকেল স্কুল নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় কারসাজি করেছিল। নারীরা পড়াশোনা শেষে চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দিতে পারেন—এমন ভিত্তিহীন আশঙ্কাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এরপর জাপানের মেডিকেল শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০২৩ সালে দেশটির মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ৪০ দশমিক ২ শতাংশ ছিলেন নারী, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।

ফলে নারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা কমে গেলেও নারীদের উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার প্রয়োজন এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।