মক্কা জোট : পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ফাটল?

ডেল্টা আর্ন্তজাতিক

ডেল্টা আর্ন্তজাতিক

প্রকাশিত: ৮:৪৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পবিত্র নগরী মক্কায় সম্ভাব্য আকাশ হামলার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হলেও ঘটনাটি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

পবিত্র নগরীকে ঘিরে এই ঘটনার পর সম্প্রতি স্বাক্ষরিত সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সরাসরি যুক্ত না হওয়ায় দেশটি ইসরায়েলের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে বলে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।

ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে সৌদি

দ্য জেরুজালেম পোস্টের বরাতে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। হুতিদের হামলা মোকাবিলায় তেল আবিবের কাছে গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ—এমন দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। রিয়াদ আব্রাহাম অ্যাকর্ডসেও যোগ দেয়নি। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে স্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয় অগ্রগতি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে সৌদি আরব সম্মত নয়।

তবে ইসরায়েলি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হুতিদের সামরিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সৌদি আরব ইসরায়েলের সহায়তা চেয়েছে।

আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো ইসরায়েল এবং কয়েকটি আরব ও মুসলিম দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে আমেরিকার মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত চুক্তিসমূহের একটি কাঠামো।

পাকিস্তানের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি

এর আগে ইয়েমেনে হুতিদের লক্ষ্য করে সৌদি হামলায় সরাসরি যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ জানিয়েছিল, সদ্য স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামো এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এটি এখনই পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়েছে বলে বিবেচনা করা উচিত নয়।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে হামলা চালাতে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর বিষয়টি এখনো একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি মাত্র।

এ অবস্থান নিয়ে সমালোচনার পর পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে মক্কা প্রতিরক্ষা জোট সক্রিয় হতে পারে।

রিয়াদ ইসলামাবাদের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না বলে জানান আসিফ। তবে চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানকে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে বা পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ মক্কাকে লক্ষ্য করে কথিত ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সৌদি সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তবে সৌদি আরবকে সম্ভাব্য সামরিক সহায়তার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।

অর্থনৈতিক স্বার্থ ও নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে গত মাসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটের জন্য হুতিদের সঙ্গে সংঘাতকে প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা।

তবে পাকিস্তানের জন্য হুতিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে পাকিস্তান উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে এবং এসব দেশের বিনিয়োগের ওপরও নির্ভরশীল।

অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ওপর পাকিস্তানের নির্ভরতা রয়েছে। ইরান ও হুতিরা এসব গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হওয়ায় তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সৌদির অভিযোগ অস্বীকার হুতিদের

সৌদি আরবের দাবি, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মক্কার দক্ষিণে একটি হুতি ড্রোন শনাক্ত করে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি ধ্বংস করে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি ঘটনাটিকে ‘শত্রুতামূলক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হাজিদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য ‘লাল রেখা’।

২০১৭ সালের জুলাইয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর মক্কাকে লক্ষ্য করে এটি দ্বিতীয় হামলার চেষ্টা বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে মক্কাকে লক্ষ্য করার অভিযোগ স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছে হুতিরা। হুতি সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারি সৌদি আরবের অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেন।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, হুতিদের অভিযান সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়, পবিত্র স্থানগুলোকে নয়।

এক বিবৃতিতে সারি আরও দাবি করেন, চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান ৪৫০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহারের পাশাপাশি বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এ ছাড়া মারিবের আকাশসীমায় স্থানীয়ভাবে তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবিও করেন সারি।

তিনি আরও জানান, ধ্বংসাবশেষ খুঁজতে আসা এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমানের দুটি বহরকে হুতি বাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছে।