কানাডার নতুন নিয়ম: সুযোগের সঙ্গে বাড়ছে দায়িত্ব

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৮:৪৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬

কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য। উন্নত শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ—সব মিলিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা দেশটিকে ভবিষ্যৎ গড়ার অন্যতম প্রধান ঠিকানা হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে সেই সুযোগের পথ এখন আরও নিয়মতান্ত্রিক হচ্ছে।

২০২৬ সাল থেকে কানাডায় পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বাইরে কাজ করতে হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সাতটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। বিষয়টি অনেকের কাছে নতুন বাধা মনে হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত সুযোগকে আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করার একটি উদ্যোগ।

গত কয়েক বছরে কানাডায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ। একই সঙ্গে কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনার চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কানাডা সরকার এখন এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে চাইছে, যেখানে প্রকৃত শিক্ষার্থীরা সুযোগ পাবেন এবং নিয়মের অপব্যবহার কমবে।

নতুন নিয়মে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিক্ষার্থীকে অবশ্যই অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী হতে হবে, বৈধ স্টাডি পারমিট থাকতে হবে, নির্ধারিত মেয়াদের শিক্ষাক্রমে ভর্তি থাকতে হবে এবং কাজ শুরুর আগে সোশ্যাল ইন্স্যুরেন্স নাম্বার (SIN) সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ, কাজের সুযোগটি শিক্ষার বিকল্প নয়; বরং শিক্ষার পাশাপাশি একটি সহায়ক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক শিক্ষার্থী কানাডায় যাওয়ার ক্ষেত্রে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেন। কারণ বিদেশে থাকা, থাকা-খাওয়ার খরচ এবং শিক্ষার ব্যয় অনেকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র কাজের সম্ভাবনা দেখে নেওয়া উচিত নয়। শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।

নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অভিবাসনের ক্ষেত্রে তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি কিংবা নিয়ম না জেনে কাজ শুরু করা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। একজন শিক্ষার্থীকে জানতে হবে, তার স্টাডি পারমিটে কাজের অনুমতি আছে কি না, তার শিক্ষাক্রমের যোগ্যতা কী এবং কোন নিয়ম তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কানাডা একই সঙ্গে স্টাডি পারমিটের জন্য আর্থিক সক্ষমতার শর্তও কঠোর করছে। এর মাধ্যমে দেশটি একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাইছে—আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যেন শুধু কাজের আয়ের ওপর নির্ভর করে কানাডায় না আসেন, বরং নিজেদের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে আসেন।

তবে সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে। নিয়ম পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও আবেদনকারীদের কাছে সহজ ভাষায় তথ্য পৌঁছে দেওয়া জরুরি। কারণ জটিল নিয়ম অনেক সময় প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্যও বিভ্রান্তি তৈরি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সমন্বিত ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

কানাডার নতুন নীতি আসলে একটি বার্তা দিচ্ছে—সুযোগ থাকবে, তবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। যারা সত্যিকার অর্থে শিক্ষা অর্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কানাডায় যেতে চান, তাদের জন্য পথ এখনো খোলা। কিন্তু শুধু কাজের সুযোগের আশায় নয়, সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়ম মেনে এগোলেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাওয়া সম্ভব।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কানাডার দরজা বন্ধ হচ্ছে না; বরং সেই দরজায় প্রবেশের নিয়ম আরও পরিষ্কার করা হচ্ছে। আর এই নিয়ম মেনে চলার সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে কে সুযোগকে সফলতায় রূপ দিতে পারবেন।

 

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা