এক দশকে প্রতিরক্ষা শিল্পে ভারতের বড় উত্থান

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ৮:১৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

গত এক দশকে অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে ভারতে। অস্ত্র, সামরিক প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়েছে দেশটি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে।

প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, ক্রয়নীতি সংস্কার, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো বিষয়কে এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বড় পরিবর্তন

২০২৫–২৬ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি রুপির তুলনায় ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ২০২০–২১ অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৮৪ হাজার ৬৪৩ কোটি রুপি। আর ২০১৩–১৪ অর্থবছরে ছিল ৪৩ হাজার ৭৪৬ কোটি রুপি।

ভারত সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ লাখ কোটি রুপি এবং রপ্তানি ৫০ হাজার কোটি রুপিতে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

প্রতিরক্ষা বাজেটও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩–১৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি থেকে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৭ লাখ ৮৫ হাজার কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে প্রতিরক্ষা খাতে মূলধনি ব্যয় ২০১৪–১৫ অর্থবছরের ৯৪ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯৫ লাখ রুপি থেকে বেড়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি রুপিতে হয়েছে।

রপ্তানিতে বড় উত্থান

প্রতিরক্ষা রপ্তানিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩–১৪ অর্থবছরে ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল ৬৮৬ কোটি রুপি। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে রেকর্ড ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ভারতের তৈরি প্রতিরক্ষা পণ্য এখন ৮০টির বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

গত অর্থবছরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ১৭ হাজার ৩৫৩ কোটি রুপির প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি করেছে, যা মোট রপ্তানির ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। সরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর রপ্তানি ছিল ২১ হাজার ৭১ কোটি রুপি বা ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

সামগ্রিক প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশ প্রায় ৭৬ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের অংশ ২৪ শতাংশ। বেসরকারি খাতের উৎপাদনের মূল্য প্রায় ৪২ হাজার কোটি রুপি।

দেশীয় উৎপাদনে জোর

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে ভারতের প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। দেশীয় নকশা, উৎপাদন ও উপাদান ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্টআপকে প্রতিরক্ষা খাতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

‘ইনোভেশনস ফর ডিফেন্স এক্সিলেন্স’ বা আইডেক্স কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিরক্ষা খাতে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতেও বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০১৪–১৫ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার গবেষণা ও উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৭১৬ কোটি ১৪ লাখ রুপি। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ১০০ কোটি ২৫ লাখ রুপি।

২০২২–২৩ অর্থবছর থেকে গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটের ২৫ শতাংশ শিল্প, স্টার্টআপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

সামরিক সরঞ্জামে দেশীয় সক্ষমতা

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় উৎপাদনের পরিধি বাড়ানোর ফলে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও উপাদানে আমদানিনির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে। সরকারি তথ্য বলছে, বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের প্রায় ৬৫ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে; আগে দেশটির প্রতিরক্ষা চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আমদানিনির্ভর ছিল।

দেশীয় সক্ষমতা বাড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের সময় গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম দ্রুত উৎপাদন, পুনরায় মজুদ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামতের সক্ষমতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জামের পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের সুযোগও বাড়ে।

সব মিলিয়ে গবেষণা, নকশা, পরীক্ষা, উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকায়ন ও রপ্তানিকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে ভারত। তবে দেশীয় সক্ষমতা বাড়লেও সব ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও উপাদানে আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি দূর হয়েছে—এমন দাবি করা হয়নি।