যুক্তরাজ্যে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরির অভিযোগ, তদন্তে শতাধিক আবেদন
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৫:০৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পাওয়ার জন্য জাল নথি, সাজানো ছবি ও মনগড়া প্রমাণ তৈরির অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় কয়েকজন। সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে লন্ডনে অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশি এক সংগীতশিল্পীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ব্রিটিশ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে—এমন শতাধিক আশ্রয় আবেদন পুনরায় যাচাই করছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত ৬ অক্টোবর লন্ডনের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মোবাইল ফোন, অলংকার ও কয়েক হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অর্থের বিনিময়ে জাল নথি তৈরির অভিযোগ
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সন্দেহ, পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি এলজিবিটি সংগঠন ‘আপনজন’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য জাল প্রত্যয়নপত্র, সাজানো ছবি ও সমলিঙ্গের সম্পর্কের পক্ষে মনগড়া চিঠি তৈরি করত।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টার জানিয়েছেন, সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি সন্দেহজনক আশ্রয় আবেদন যাচাই করতে গিয়ে তদন্তের সূত্রপাত হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এসব নথি তৈরির জন্য আবেদনকারীদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো।
আশ্রয়প্রার্থীরা এসব নথি ব্যবহার করে দাবি করতেন, যৌন অভিমুখিতার কারণে নিজ দেশে ফিরে গেলে তাঁরা নির্যাতন বা প্রাণনাশের ঝুঁকিতে পড়বেন। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
সরকারি পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ দ্বিতীয়
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে যৌন অভিমুখিতাকে আশ্রয় আবেদনের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এমন আবেদনের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫০২। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৩২৪টি এবং বাংলাদেশিদের ১৪৮টি।
২০২৩ সালে এ ধরনের আবেদনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৭৭। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৫৭৮টি, আর বাংলাদেশিদের ১৭৫টি।
তবে এসব পরিসংখ্যান দিয়ে আবেদনগুলো জাল ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে আশ্রয় চাওয়া এবং আশ্রয় আবেদনে জালিয়াতির অভিযোগ দুটি আলাদা বিষয়। এসব আবেদনকারীর সবাই আশ্রয় পেয়েছেন, এমন তথ্যও পরিসংখ্যানে নেই।
বিবিসির অনুসন্ধানেও উঠে আসে জালিয়াতির অভিযোগ
চলতি বছরের এপ্রিলে বিবিসির এক গোপন অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যের আশ্রয়ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে জাল নথি ও মনগড়া প্রমাণ তৈরির অভিযোগ উঠে আসে। বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে সাংবাদিকেরা কয়েকজন অভিবাসন পরামর্শদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের কাউকে সমকামী, নাস্তিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। অর্থের বিনিময়ে সাজানো ছবি, প্রত্যয়নপত্র, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নিপীড়নের দাবির পক্ষে প্রমাণ তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
এ ছাড়া ভুয়া সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট তৈরি, সাজানো রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং চিকিৎসকের কাছে অসুস্থতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাল আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
বিবিসির অনুসন্ধানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক আইনজীবীর কার্যক্রমও আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ছদ্মবেশী সাংবাদিকদের সমকামী, নাস্তিক বা রাজনৈতিক কর্মী পরিচয়ে আশ্রয় আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে ওই আইনজীবী ইচ্ছাকৃতভাবে বেআইনি বা অসৎ আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২২ সালে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন, তবে তাঁর আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি নেই।
আশ্রয় জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আশ্রয়ব্যবস্থায় প্রতারণাকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে কেউ অভিবাসন মর্যাদা অর্জন করে থাকলে তা বাতিল করা হতে পারে। আশ্রয় জালিয়াতির অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।
সন্দেহভাজন চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত শতাধিক আবেদন পুনরায় যাচাইয়ের পাশাপাশি সাম্প্রতিক অভিযানের তদন্তও চলছে। তবে অভিযোগের তদন্ত এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।



