ভারতীয় ভিসা জটিলতায় গ্রিসে যেতে পারছেন না বাংলাদেশি কর্মীরা
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৪:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
বাংলাদেশ থেকে বছরে চার হাজার কর্মী নেওয়ার কথা থাকলেও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় গ্রিসে বৈধভাবে যেতে পেরেছেন ৫০০ জনেরও কম বাংলাদেশি। ভিসা জটিলতা, নিয়োগদাতা ও কর্মীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার নানা বাধায় চুক্তির প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না কর্মীরা। গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) অভিবাসনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টসকে ই-মেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত জানান, ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে সই হওয়া শ্রমিক নিয়োগসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক এখনো কার্যকর রয়েছে। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে এর আওতায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না।
রাষ্ট্রদূত বলেন, সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে কতজন কর্মী গ্রিসে প্রবেশ করেছেন, তার প্রকৃত সংখ্যা দূতাবাসের জানা নেই। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর দূতাবাসের মাধ্যমে সেবা পাওয়া কর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে সাধারণভাবে ৫০০ জনেরও কম বাংলাদেশি বৈধভাবে গ্রিসে গেছেন।
ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় বাধা
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিসা প্রক্রিয়া। গ্রিসের ভিসার আবেদন করতে বাংলাদেশিদের ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত গ্রিক দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়। এর আগে গ্রিসের কোনো নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাকরির চুক্তি সংগ্রহ করতে হয়। পাশাপাশি বৈধ পাসপোর্ট, পূরণ করা ভিসার আবেদনপত্র, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সনদ এবং ভিসা ফি জমার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র দিতে হয়।
নয়াদিল্লিতে যাওয়ার জন্য ভারতীয় ভিসা প্রয়োজন হওয়ায় আবেদনকারীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা বলেন, বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতীয় ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ফলে অনেক আবেদনকারী গ্রিক ভিসার সাক্ষাৎকারের ডাক পেয়েও ভারতে যেতে না পারায় সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে পারেননি।
এ ছাড়া নিয়োগদাতা ও কর্মীর মধ্যে চাকরির উপযুক্ত সমন্বয় খুঁজে বের করার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা কম হওয়ায় অনেকে বৈধ পথে গ্রিসে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন। কেউ কেউ গ্রিসে থাকা পরিচিতজনদের ওপর নির্ভর করছেন, আবার কেউ পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
বিকল্প ভিসাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা জটিলতা কমাতে গ্রিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে বাংলাদেশ। বিকল্প স্থানে ভিসার আবেদন জমা দেওয়া এবং ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকারের সুযোগ চালুর বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মতো সরকারি সংস্থাকে কর্মীদের আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে। তবে বিকল্প ভিসাব্যবস্থা চালুর বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমাও ঘোষণা করা হয়নি।
সচেতনতার অভাব, নিয়োগেও জটিলতা
ভিসা জটিলতার পাশাপাশি বাংলাদেশে বৈধ পথে গ্রিসে কাজ করতে যাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। অনেক সম্ভাব্য কর্মী আবেদনপ্রক্রিয়া, খরচ ও প্রয়োজনীয় সময় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান না। অন্যদিকে, গ্রিসের অনেক নিয়োগদাতাও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় কর্মী নিয়োগের নিয়ম সম্পর্কে জানেন না বা এ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে প্রস্তুত নন।
রাষ্ট্রদূতের মতে, এগুলো রাজনৈতিক নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক সমস্যা। এসব জটিলতা দূর করতে বাংলাদেশ চুক্তি সম্পর্কে প্রচার বাড়ানো এবং বোয়েসেল ও গ্রিক নিয়োগদাতাদের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে।
চুক্তির আওতায় কৃষি খাতে মৌসুমি কর্মী নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ, পর্যটন, আতিথেয়তা ও নির্দিষ্ট কিছু সেবা খাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব খাতে গ্রিক নিয়োগদাতাদের চুক্তির আওতায় কর্মী নিতে আগ্রহী হতে হবে।
হাজারো বাংলাদেশি পেয়েছেন বৈধতা
নতুন কর্মী নিয়োগে জটিলতা থাকলেও গ্রিসে আগে থেকে বসবাসরত নির্দিষ্ট কিছু অনথিভুক্ত বাংলাদেশিকে বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির আওতায় অগ্রগতি হয়েছিল।
গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৩৩৭ জন অনথিভুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসী বৈধতা পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে তিন হাজার ৪০৫ জন বসবাসের অনুমতিপত্র বা বৈধ মর্যাদা পেয়েছিলেন। বিভিন্ন কারণে বাতিল হয়েছিল এক হাজার নয়টি আবেদন।
তবে এসব পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের শুরুর দিকের পরিস্থিতি তুলে ধরে। পরবর্তী সময়ে আরও বাংলাদেশি বৈধতা পেয়ে থাকতে পারেন।
নিরাপদ অভিবাসনে সরকারি চ্যানেল ব্যবহারের পরামর্শ
গ্রিসে কাজ করতে আগ্রহীদের বোয়েসেল ও এথেন্সে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারি সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। দ্রুত ভিসা বা চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনানুষ্ঠানিক এজেন্টদের এড়িয়ে চলার পাশাপাশি অতিরিক্ত ফি দাবি করা ব্যক্তিদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো, গ্রিসের সঙ্গে চুক্তিটি নবায়ন ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বৈধ কর্মী নিয়োগের সংখ্যা বাড়ানো। এ জন্য ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়োগদাতাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কর্মীদের প্রতারণা ও শোষণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।



