নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগের অভাবে ঝুঁকিতে হাজারো শিশু

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৬:১৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন অভিবাসন পথে ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে অন্তত ৪ হাজার ৪১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সংস্থাটির নিখোঁজ অভিবাসীবিষয়ক তথ্যভান্ডারে নথিভুক্ত ৮১ হাজার মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল শিশু।

তবে অভিবাসন পথে নিহত শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইওএম। সংস্থাটির মতে, অনেক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয় না। বিশেষ করে সমুদ্রপথে নৌকাডুবি এবং মরদেহ শনাক্ত করতে না পারার কারণে শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

ইনফোমাইগ্রেন্টসের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

ইউরোপের সীমান্তে শিশুদের মৃত্যুর হার বেশি

আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন অভিবাসন রুটের মধ্যে বেলারুশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যবর্তী সীমান্তে নিহত অভিবাসীদের মধ্যে শিশুদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি। সেখানে নিহতদের ২৮ শতাংশ শিশু।

এ ছাড়া সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তবর্তী পথে নিহত অভিবাসীদের ২৩ শতাংশ, পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় পথে ২১ শতাংশ এবং ইংলিশ চ্যানেলে ১৪ শতাংশ শিশু।

আইওএমের মহাপরিচালক অ্যামি পোপ বলেন, অভিভাবক বা আইনি অভিভাবকের সুরক্ষা ছাড়াই শিশুরা বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নেয়। নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সীমিত থাকায় তাদের মানবপাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে তারা সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকিতে পড়ে। কোনো শিশুরই একা এসব ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া উচিত নয়।

মৃত্যুর প্রকৃত হিসাব পাওয়া কঠিন

আইওএমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিবাসন পথে নিহত শিশুদের অনেকের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির বয়সও শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

সংস্থাটির ‘মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্যভান্ডারে নথিভুক্ত ৪৪ হাজারের বেশি অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির বয়সসংক্রান্ত তথ্য নেই। বয়স অজানা এমন ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে।

মরদেহ উদ্ধার না হওয়া, প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যের অভাব, অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের ভয়—এসব কারণে মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের অনেক সময় শিশু হিসেবে শনাক্ত করা হয় না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নথিভুক্ত ৪ হাজার ৪১৪ শিশুর মৃত্যুর মধ্যে মাত্র ৮২০টির তথ্য এসেছে সরকারি সূত্র থেকে। অর্থাৎ, অধিকাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে সরকারি নথির মাধ্যমে তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি।

নৌকাডুবিতে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা

অভিবাসন যাত্রায় শিশুদের ঝুঁকির আরেকটি দিক উঠে এসেছে আইওএমের প্রতিবেদনে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, বড় নৌযানে যাত্রার সময় শিশুদের অনেককে ডেকের নিচে আটকে রাখা হয়। এতে বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়। নৌকাডুবি হলে আটকে পড়া শিশুদের পালিয়ে বাঁচার সুযোগও কমে যায়।

এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন কবরস্থানে অনেক অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের দাফন হয়। এসব মরদেহকে অভিবাসী হিসেবে শনাক্ত বা শ্রেণিবদ্ধ করা না হলে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

আইওএম বলেছে, বিশ্বের খুব কম মৃত্যু সনদেই মৃত ব্যক্তির অভিবাসী পরিচয় উল্লেখ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুর তথ্য আরও ভালোভাবে নথিভুক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফরেনসিক চিকিৎসক ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

অভিভাবকহীন শিশুর সংখ্যা বাড়ছে

জাতিসংঘের শিশু অধিকারবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অভিবাসন পথে ইউরোপে পৌঁছানো ৩১ হাজার শিশুর মধ্যে অন্তত ২০ হাজার কোনো অভিভাবক বা আইনি অভিভাবক ছাড়াই পৌঁছেছে।

আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বুলগেরিয়া, সাইপ্রাস, স্পেন, গ্রিস, ইতালি ও মাল্টায় সমুদ্র ও স্থলপথে পৌঁছানো শিশুর সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমেছে। তবে ইউরোপে পৌঁছানো শিশুদের মধ্যে অভিভাবকহীনদের অনুপাত বেড়েছে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৬৭ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে ছিল ৫১ শতাংশ।

ইতালি ও স্পেনে পৌঁছানো শিশুদের মধ্যে অভিভাবকহীনদের অনুপাত সবচেয়ে বেশি—৮৬ শতাংশ।

এদিকে, ভূমধ্যসাগরীয় পথ, পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক মহাসাগরীয় পথ ও পশ্চিম বলকান রুটে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪ হাজার ৬০০-এর বেশি কিশোর ও তরুণের সাক্ষাৎকার নিয়েছে আইওএম। তাঁদের প্রায় অর্ধেক জানিয়েছেন, তাঁরা শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে যাত্রা করা তরুণদের ২৮ শতাংশ বলেছেন, তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখা হয়েছিল। আর ১৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁদের জোর করে কাজ করানো হয়েছে। এসব নির্যাতনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে লিবিয়ায়।

অভিবাসন পথে শিশুদের মৃত্যু ও নিখোঁজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে মৃত্যুর নথি পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে আইওএম।