নিজের পা কেটে বাঁচলেন ইউক্রেনের সেনা, ৪৯১ দিন পর ড্রোনে উদ্ধার
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ২:৫৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে আটকে পড়েছিলেন ইউক্রেনের পদাতিক সেনা কস্তিয়ান্তিন ভ্লাসেঙ্কো। এক পা হারানোর পর অন্য পায়েও গুরুতর আঘাত পান তিনি। চলাফেরা করতে না পেরে আশ্রয় নেন বোমায় বিধ্বস্ত একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচের সংকীর্ণ গর্তে। সেখানে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত পায়ের অবশিষ্ট অংশ ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেন তিনি। অবশেষে ৪৯১ দিন যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানোর পর গত ৪ অক্টোবর ভারী মালবাহী ড্রোনের সাহায্যে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
৪৯ বছর বয়সী ভ্লাসেঙ্কো ইউক্রেনের ৩০তম যান্ত্রিক ব্রিগেডের সদস্য। খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারিতে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে ছিলেন তিনি। তাঁর উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা হয় ছয়টি রোটরযুক্ত একটি ভারী ড্রোন। বিশেষ হারনেসের সাহায্যে তাঁকে ড্রোনের নিচে ঝুলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, চলমান যুদ্ধে সম্মুখসারির অবস্থান থেকে আহত সেনাকে আকাশপথে ড্রোনের সাহায্যে সরিয়ে নেওয়ার এটি প্রথম পরিচিত ঘটনা। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই হয়নি।
ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত
গত বছরের মে মাসে ভ্লাসেঙ্কোকে খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। সেখানে সহযোদ্ধা ‘বাস্কি’র সাথে অবস্থান করছিলেন তিনি। এলাকাটি রুশ ড্রোনের নজরদারি ও হামলার ঝুঁকিতে থাকায় বাইরে চলাচল ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেনাদের কাছে ড্রোনের মাধ্যমে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো।
দীর্ঘ সময় অবস্থান করার পর তাঁদের আশ্রয়স্থল পানিতে ভরে গেলে ভ্লাসেঙ্কো ও বাস্কি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে চলে যান। পরে সহযোদ্ধাদের ফেলে যাওয়া খাবার ও শুকনো পোশাক আনতে বের হলে একটি রুশ নজরদারি ড্রোন তাঁদের দেখতে পায়। এরপর আরেকটি ড্রোন থেকে ফেলা বিস্ফোরকে তাঁরা আক্রান্ত হন। ওই হামলায় বাস্কি নিহত হন এবং ভ্লাসেঙ্কোর বাঁ পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর ডান পায়েও গুরুতর আঘাত লাগে।
হামাগুড়ি দিয়ে চলাও কঠিন হয়ে পড়ায় ভ্লাসেঙ্কো স্কুলের বয়লারঘরের নিচে একটি সংকীর্ণ গর্তে আশ্রয় নেন। সেখানেই মাসের পর মাস আটকে ছিলেন তিনি।
বেঁচে থাকার জন্য পা কেটে ফেলেন
ভ্লাসেঙ্কোর বর্ণনা অনুযায়ী, বাঁ পায়ের ক্ষত ধীরে ধীরে পচে যাচ্ছিল। ডান পায়ের নিচের অংশও এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে হাড় বেরিয়ে আসে। নড়াচড়া করতে গেলে সেই আঘাত আরও বাড়ছিল। একপর্যায়ে বেঁচে থাকার আশায় ছুরি দিয়ে নিজের ডান পায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলেন তিনি। এরপর রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে টর্নিকেট বাঁধেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়টার্সকে ভ্লাসেঙ্কো বলেন, তিনি প্রায় আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষ্য, নিজেকেই যেন কবর দিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। তবে তাঁর অভিজ্ঞতার সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
ড্রোনে উদ্ধারের পরিকল্পনা
রুশ ড্রোনের নজরদারি ও হামলার কারণে প্রচলিত উপায়ে ভ্লাসেঙ্কোকে উদ্ধার করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তাঁকে উদ্ধারের জন্য পাঠানো দুটি চালকবিহীন স্থলযানও হামলায় ধ্বংস হয় বলে উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান।
শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় বাহিনী গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি ছয় রোটরযুক্ত একটি ভারী ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করে। ড্রোনটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ভ্লাসেঙ্কোর কাছে বিশেষ হারনেস ও নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন পাঠানো হয়, যাতে তিনি উদ্ধারযানের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন।
৪ অক্টোবর ড্রোনটি তাঁর অবস্থানে পৌঁছালে ভ্লাসেঙ্কো হারনেসের সাহায্যে নিজেকে ড্রোনের সাথে যুক্ত করেন। এরপর তাঁকে আকাশে তুলে নিরাপদ স্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযান চলাকালে ইউক্রেনের অন্যান্য ড্রোন ও সামরিক ইউনিটও সহায়তা দেয়। প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাঁকে নিরাপদ স্থানে নামানো হয়। পরে তাঁকে খারকিভের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
উদ্ধারের সময়ও ভ্লাসেঙ্কোর মনে ভয় ছিল। তিনি জানান, জঙ্গলে পড়ে যাওয়ার চেয়ে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই তাঁকে বেশি আতঙ্কিত করছিল, কারণ তিনি সাঁতার জানেন না।
দীর্ঘ ৪৯১ দিনের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা, গুরুতর আঘাত এবং সহযোদ্ধাকে হারানোর পর অবশেষে উদ্ধার হন ভ্লাসেঙ্কো। তাঁর ঘটনা একদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে, অন্যদিকে আহত সেনাদের উদ্ধারে ড্রোন প্রযুক্তির নতুন ব্যবহারের সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।



