৭৫ দেশের ভিসা স্থগিত: আদালতের রায়ে নতুন মোড়
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০২৬
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে আমেরিকার একটি ফেডারেল আদালত ২১ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার বেআইনি ঘোষণা করেছে। নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল আদালতের এই রায় দীর্ঘদিন ধরে ভিসার অপেক্ষায় থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। একই সাথে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন ও ব্যক্তির অধিকার রক্ষার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখা হয়েছিল। আবেদনকারীরা আবেদন জমা দিতে এবং সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে পারলেও ভিসা ইস্যু বন্ধ থাকায় অনেক পরিবার দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসী ভিসার আবেদনকারীদের জন্য পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর অভিবাসীরা আমেরিকায় গিয়ে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব অভিবাসন নীতি নির্ধারণের অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু শুধু কোনো একটি দেশের নাগরিক হওয়ার কারণে সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই সিদ্ধান্ত প্রয়োগ কতটা ন্যায়সংগত—সেই প্রশ্নই আদালতের রায়ে গুরুত্ব পেয়েছে।
আদালতের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রত্যেক আবেদনকারীর পরিস্থিতি আলাদাভাবে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। শুধু জাতীয়তার ভিত্তিতে ভিসা আটকে না রেখে আবেদনকারীর যোগ্যতা, পরিস্থিতি ও আইনি অবস্থান বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাই আদালত তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য এই রায় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে যেসব পরিবার অভিবাসী ভিসার অপেক্ষায় ছিল, তাদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। কেউ স্বামী বা স্ত্রীর সাথে যুক্ত হতে চাচ্ছেন, কেউ বাবা-মা বা সন্তানের কাছে যেতে অপেক্ষা করছেন। আবার কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসী ভিসার আবেদনকারীরাও দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
তবে আদালতের এই রায়কে এমনভাবে দেখার সুযোগ নেই যে এখনই সব বাংলাদেশি আবেদনকারীর ভিসা অনুমোদিত হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্ত ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নয়; বরং ৭৫ দেশের নাগরিকদের ওপর সামগ্রিকভাবে ভিসা স্থগিত রাখার নীতির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সিদ্ধান্ত। প্রত্যেক আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং বিদ্যমান আইন ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমেরিকার সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করবে কি না। আপিল হলে বিষয়টি আরও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে। ফলে ভিসা আবেদনকারীদের ধৈর্য ধরার পাশাপাশি সরকারি সূত্রের তথ্য অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—দালাল ও প্রতারকচক্র থেকে সতর্ক থাকা। আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে কেউ যদি দ্রুত ভিসা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ দাবি করে, তাহলে যথাযথভাবে যাচাই না করে কোনো লেনদেন করা উচিত নয়।
অভিবাসন নীতি নির্ধারণ একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। তবে সেই নীতির প্রয়োগ হতে হবে আইনসম্মত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত। কোনো নীতির কারণে হাজার হাজার মানুষের পারিবারিক জীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লে তার মানবিক দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের ভিসা স্থগিতের নীতির বিরুদ্ধে আদালতের এই রায় শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি অবস্থান নয়; এটি ব্যক্তির অধিকার, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসনের পক্ষেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
এখন প্রয়োজন আদালতের রায়ের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের বিষয়ে দ্রুত, স্বচ্ছ ও ব্যক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত। তাহলেই এই রায় বাস্তবে অভিবাসনপ্রত্যাশী পরিবারগুলোর অনিশ্চয়তা কাটানোর পথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা


