উমুগান্ডা কবে আসবে বাংলাদেশে?
মহিবুল ইসলাম মাসুম
প্রকাশিত: ২:৫৮ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৬, ২০২৬
রুয়ান্ডাকে আফ্রিকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ বলা হলেও এর পেছনের আসল রহস্য শুধু প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ নয়- রহস্যটি হলো উমুগান্ডা। কিনিয়ারুয়ান্ডা ভাষায় যার অর্থ “একই উদ্দেশ্যে একত্রিত হওয়া”, এই সামষ্টিক শ্রমের ঐতিহ্য ঔপনিবেশিক যুগেরও আগে থেকে রুয়ান্ডার সমাজে প্রচলিত ছিল। আধুনিককালে শুরুটা ১৯৭৪ সালে, তবে ১৯৯৪ সালের ভয়াবহ গণহত্যার পর ছিন্নভিন্ন জাতিকে জোড়া লাগাতে রুয়ান্ডা সরকার এই পুরোনো প্রথাকেই নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় ১৯৯৮ সালে; সরকার একে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও জাতীয় ঐক্যের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বহাল করে। প্রতি মাসের শেষ শনিবার সকাল ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী প্রতিটি সক্ষম নাগরিক-এমনকি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত—রাস্তা পরিষ্কার, নর্দমা সংস্কার ও গাছ লাগানোর কাজে অংশ নেন; সে সময় দোকানপাট বন্ধ থাকে, গণপরিবহনও থমকে যায়। এই সম্মিলিত শ্রমের সকালটিকে একটি সামাজিক মঞ্চ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়, যেখানে স্থানীয় নেতারা তথ্য বিনিময় করেন এবং নাগরিকরা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন।

ফলাফল স্পষ্ট। দ্য আফ্রিকা রিপোর্টের ২০২৫ সালের জরিপে ৪১টি শহরের মধ্যে রাজধানী কিগালি ৯.৪ স্কোর নিয়ে আফ্রিকার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে শীর্ষে উঠে আসে। বিপরীতে, ইয়েল ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৫তম-বিশ্বের সর্বনিম্ন সারিতে।
রুয়ান্ডা একা নয়। বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ ভিন্ন পথে একই লক্ষ্যে পৌঁছেছে। জাপানে সরকারি ডিক্রি নয়, বরং স্কুল থেকেই শুরু হয় পরিচ্ছন্নতার পাঠ- শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে নিজেদের শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে, যা কেবল অভ্যাস নয়, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলা হয়। সিঙ্গাপুর আবার আইনি কঠোরতার পথ বেছে নিয়েছে-রাস্তায় ময়লা ফেললে প্রথমবারেই প্রায় দুই হাজার সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে, পাশাপাশি ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন সিঙ্গাপুর’ নামের জাতীয় প্রচারাভিযান ও ভর্তুকিযুক্ত আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিকদের পরিচ্ছন্ন জীবনযাত্রায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় আবার প্রযুক্তিনির্ভর জবাবদিহির মডেল—যেকোনো নাগরিক বেনামে ময়লা ফেলার ঘটনা রিপোর্ট করতে পারেন এমন একটি হুইসেলব্লোয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনের বাস্তবায়ন জোরদার করা হয়েছে। অর্থাৎ পথ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য অভিন্ন—নাগরিককে দর্শক নয়, অংশীদার বানানো।
বাংলাদেশের সমস্যা মূলত আইনের অভাব নয়, সমস্যা আইন বাস্তবায়ন ও অভ্যাসের। রাস্তায় ময়লা ফেলা, ড্রেনে পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট ফেলে দেওয়া, চলন্ত বাস বা বাসাবাড়ির জানালা দিয়ে সরাসরি রাস্তায় আবর্জনা ছুড়ে ফেলা, খালি জমি বা পতিত প্লটকে অস্থায়ী ডাস্টবিনে পরিণত করা, নর্দমা বন্ধ করে দোকান বসানো, নির্মাণ বর্জ্য রাস্তায় ফেলে রাখা—এসব “ছোট” অভ্যাসই বর্ষায় হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ প্রায় প্রতিটি শহরে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয় মূলত ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে; পানিবাহিত রোগ ছড়ায়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষ মারা যায়, দুর্ভোগে পড়ে লাখো মানুষের জীবিকা। আর এই ব্যর্থতার দায় শুধু নাগরিকের একার নয়—সিটি করপোরেশনের নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা, ময়লা সংগ্রহে সময়সূচি না মানা এবং তদারকির অভাবও এই সংকটকে প্রতি বছর আরও গভীর করে তোলে।
রুয়ান্ডা ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে বাংলাদেশ অন্তত তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রথমত, ঠিক রুয়ান্ডার মতই, প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট শনিবারকে জাতীয় “পরিচ্ছন্নতা সকাল” ঘোষণা করে ওয়ার্ড পর্যায়ে স্থানীয় সরকার, কাউন্সিলর ও নাগরিকদের যৌথ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে—আর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নিছক নির্দেশের বদলে প্রণোদনার পথ নেয়া জরুরি: নিয়মিত অংশগ্রহণকারী পরিবারকে হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌর সেবা ফি-তে ছাড়, সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন মহল্লা বা ওয়ার্ডকে মাসিক স্বীকৃতি ও ছোট অনুদান, স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য সনদ বা সহপাঠ্যক্রম নম্বর, এমনকি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য লাইসেন্স নবায়নে অগ্রাধিকার—এ ধরনের বাস্তব প্রণোদনা অংশগ্রহণকে টেকসই করতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কেবল তত্ত্ব নয়, জাপানের ধাঁচে ব্যবহারিক ও নম্বরযুক্ত বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন—শিক্ষার্থীরা নিজ শ্রেণিকক্ষ ও প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করলে, সপ্তাহে অন্তত একবার প্রতিষ্ঠান বা আশপাশের এলাকা পরিষ্কারের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত হলে, অভ্যাসটা ছোটবেলা থেকেই মজ্জাগত হয়ে উঠবে। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক নিষেধাজ্ঞার মতো আইনের প্রকৃত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সিঙ্গাপুরের ধাঁচে দৃশ্যমান ও সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য জরিমানা দিয়ে, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সহজ মোবাইল অ্যাপে নাগরিক-অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করে, এবং সেই সাথে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কার্যক্রম—ড্রেন পরিষ্কারের সময়সূচি, বর্জ্য সংগ্রহের হার, ঠিকাদারদের কাজের মান—জনসমক্ষে প্রকাশ ও নিয়মিত মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে, যাতে জবাবদিহিটা নাগরিক ও প্রশাসন উভয় পক্ষেই সমানভাবে বর্তায়।
উমুগান্ডা প্রমাণ করে, পরিচ্ছন্নতা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় ইচ্ছাশক্তি ও নাগরিক দায়বদ্ধতার ফসল। বাংলাদেশ যদি প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা আর মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি রুখতে চায়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি রুয়ান্ডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো নিজেদের অভ্যাস ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি, দুটোই বদলাতে প্রস্তুত?
সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা


