ভিসা জটিলতায় অস্ট্রেলিয়ামুখী শিক্ষার্থীদের আগ্রহে ভাটা
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৬:০৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২৬
ভিসা প্রত্যাখ্যানের উচ্চ হার, আবেদন ফি বৃদ্ধি ও অভিবাসননীতির অনিশ্চয়তায় অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ে। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় আর্থিক সংকট সামাল দিতে কর্মী ছাঁটাই ও বাজেট সংকোচনের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
১১ অক্টোবর প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতি উঠে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষা বিভাগের অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আসনের গড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পূরণ করতে পেরেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দেশটির ৩৬টি প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র পাঁচটি তাদের বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি আসন পূরণ করতে পেরেছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে বড় শহরের বাইরের আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
নিউ সাউথ ওয়েলসের চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটি চলতি বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আসনের মাত্র ৪০ শতাংশ পূরণ করতে পেরেছে। গত বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। মহামারির আগের সময়ের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তা মাইক ফার্গুসনের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় বছরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফার্গুসন বলেন, স্টুডেন্ট ভিসার উচ্চ আবেদন ফি এবং ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার এই সংকটের অন্যতম কারণ। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন ফি ২ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলীয় ডলার। ভিসা প্রত্যাখ্যাত হলেও এই অর্থ ফেরত পাওয়া যায় না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবেদনকারীদের প্রায় ৫৩ শতাংশের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। এতে বিপুল অর্থ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন এসব দেশের শিক্ষার্থীরা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সিডনির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক জর্জ উইলিয়ামস সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে দেশীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার বড় অংশের ব্যয় নির্বাহ করা হয়। বিদেশি শিক্ষার্থী কমে গেলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি সেবা এবং গবেষণা কার্যক্রম চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছে ভিক্টোরিয়ার ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি। সংকট মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির উপাচার্য ডানকান বেন্টলি আঞ্চলিক এলাকার জন্য বিশেষ দক্ষতাভিত্তিক স্টুডেন্ট ভিসা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা খাতের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী ফিল হানিউড উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে ভবিষ্যতে সেবিকা, শিশু পরিচর্যা, প্রবীণ সেবা ও প্রকৌশলের মতো খাতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া সরকার ২০২৬ সালে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির জাতীয় সীমা ২ লাখ ৯৫ হাজার নির্ধারণ করেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বছর শেষে নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা আড়াই লাখে সীমিত থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২ অক্টোবর থেকে অধিকাংশ অস্থায়ী ভিসাধারীর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে নতুন স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করার সুযোগ বন্ধ করেছে সরকার। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক জোট ক্ষমতায় গেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমিয়ে বছরে ২ লাখ ৪০ হাজারে সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ভিসা প্রক্রিয়ার কঠোরতা, উচ্চ আবেদন ফি এবং অভিবাসননীতির অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে অস্ট্রেলিয়ার উচ্চশিক্ষা খাতে সংকট আরও বাড়তে পারে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজস্ব, গবেষণা কার্যক্রম এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



