ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিদের মৃত্যু

ভারতের হোটেলগুলো কি বিদেশি অতিথিদের জন্য মৃত্যুফাঁদ?

মহিবুল ইসলাম মাসুম

মহিবুল ইসলাম মাসুম

প্রকাশিত: ৩:৩৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে ১৯ আগস্ট ২০২৬ ভোররাতে পাঁচতলা একটি ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ৫ জন বাংলাদেশি বলে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। ভবনটিতে গাদাগাদি করে চলছিল একাধিক হোটেল ও গেস্টহাউস। ঘন ধোঁয়া, সরু সিঁড়ি, সীমিত বহির্গমনপথ আর জানালাবিহীন কক্ষ—সব মিলিয়ে বহু অতিথি আটকা পড়েন নিজেদের ঘরেই। প্রায় ৮০ জনকে উদ্ধার করা গেলেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে নিছক শ্বাসরোধে।

এই তালিকায় সবচেয়ে হৃদয়বিদারক কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারের পরিণতি। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া দেবাশীষ, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, ছোট ছেলে ও শ্বশুর—চারজনই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন। কুষ্টিয়ার পরিবারটির জন্য এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, একটি সংসারের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া।

সময়ের ব্যবধানটিও ভয়ংকর। এই ঘটনার মাত্র দুই দিন আগে, অর্থাৎ ১৭ আগস্ট ২০২৬ বীরভূমের তারাপীঠে একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ জন পুণ্যার্থী মারা যান, যাদের মধ্যে দুই শিশুও ছিল। সেখানেও একই অভিযোগ—উদ্ধারে বিলম্ব, ঘন ধোঁয়া, দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা।

তাহলে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য: দুই দিনের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের দুটি হোটেলে এত প্রাণহানি কি নিছক দুর্ঘটনা, দুর্ভাগ্য? লাইসেন্স দেয়ার আগে অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই হয় না? জরুরি বহির্গমনপথ, অ্যালার্ম, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ভবনের ধারণক্ষমতা—এসব নিয়মিত পরীক্ষা করে কে?

কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিট দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি চিকিৎসাপ্রার্থী ও পর্যটকদের প্রিয় আবাসিক এলাকা। কিন্তু ঘিঞ্জি এই এলাকায় একই ভবনে একাধিক ছোট হোটেল, অফিস ও দোকান গাদাগাদি করে চালানোর যে চিত্র, তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। ২০২৬ সালের জুনে দিল্লির মালভিয়া নগরে একটি হোটেল অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২১ জন মারা যান, যাদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, মোজাম্বিক ও লাইবেরিয়ার নাগরিকও। তদন্তে বেরিয়ে আসে, ৬টি কক্ষের অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছিল প্রায় ২৫টি কক্ষ। এর আগে ২০১৯ সালে করোলবাগের অর্পিত প্যালেস হোটেলের আগুনেও মারা যান ১৭ জন, যাদের মধ্যে ছিলেন দুই মিয়ানমার নাগরিক—সেখানেও ধরা পড়ে জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থার গুরুতর ঘাটতি।

অর্থাৎ প্রশ্নটি আর কেবল ‘আগুন লাগল কেন’ নয়। প্রশ্ন হলো, আগুন লাগার পর মানুষ বের হতে পারল না কেন। কেন নিয়ম ভাঙা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্ঘটনার আগে শনাক্ত হয় না, আর কেন প্রতিটি ট্র্যাজেডির পরই কেবল নতুন ‘সেফটি অডিট’-এর প্রতিশ্রুতি আসে।

ভারত বাংলাদেশিদের কাছে চিকিৎসা ও পর্যটনের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই একটি অনিরাপদ হোটেলে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি কি কারও নেয়ার কথা? বিদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি ভিসা প্রদানের সাথে যুক্ত রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ নয়?

কলকাতা ও ভারতের অন্য শহরগুলোর প্রশাসনের কাছে এখন জরুরি প্রশ্ন একটাই—শোকবার্তা নয়, জবাবদিহি কোথায়? পুলিশ, দমকল, পৌর কর্তৃপক্ষ ও রাজ্য প্রশাসন—কার কোন স্তরে ব্যর্থতা ছিল, তা প্রকাশ্যে আসা জরুরি। তদন্তে শুধু আগুনের উৎস নয়, খুঁজে বের করতে হবে সেই প্রশাসনিক শৈথিল্যও, যেখানে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব কারও না কারও ছিল।

তবে একটি ভিন্ন দেশের প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় বসে না থেকে একজন সাধারণ পর্যটক বা রোগী নিজেও কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে ঝুঁকি অনেকটা কমাতে পারেন—

হোটেলে ঢোকার আগেই যাচাই করুন: ভবনটির বৈধ ফায়ার লাইসেন্স ও অগ্নিনির্বাপণ সনদ আছে কি না, সম্ভব হলে অনলাইন রিভিউ বা স্থানীয় সূত্রে যাচাই করে নিন।

প্রবেশ ও বহির্গমনপথ চিনে রাখুন: চেক-ইনের পরপরই হোটেলের মূল প্রবেশ ও বহির্গমনপথ, লিফট ও সিঁড়ির অবস্থান নিজে হেঁটে দেখে নিন।

ফায়ার এক্সিট শনাক্ত করুন: ঘরে ঢোকার পরই নিকটতম জরুরি নির্গমনপথ (fire exit) কোথায়, তা খুঁজে বের করুন এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় একটি বিকল্প পথও মনে রাখুন।

কক্ষ নির্বাচনে সতর্ক থাকুন: যতটা সম্ভব নিচতলা বা সিঁড়ির কাছাকাছি কক্ষ নিন এবং জানালাবিহীন বা শুধু একটিমাত্র বের হওয়ার পথযুক্ত কক্ষ এড়িয়ে চলুন।

জরুরি নম্বর হাতের কাছে রাখুন: স্থানীয় দমকল বাহিনী, পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর এবং হোটেলের রিসেপশন নম্বর মোবাইলে সংরক্ষণ করুন।
স্মোক অ্যালার্ম ও নির্বাপণ যন্ত্র আছে কি না দেখুন: ঘরে ও করিডোরে ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্র ও অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (fire extinguisher) কার্যকর অবস্থায় আছে কি না চোখে দেখে নিশ্চিত হোন।

আগুন লাগলে করণীয় জানুন: আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সবচেয়ে কাছের জরুরি নির্গমনপথ ব্যবহার করুন, লিফট এড়িয়ে সবসময় সিঁড়ি ব্যবহার করুন, ধোঁয়া বেশি থাকলে মেঝের কাছাকাছি নিচু হয়ে এগোন এবং সম্ভব হলে ভেজা কাপড় দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে রাখুন।
বের হতে না পারলে: দরজা বন্ধ রেখে দরজার ফাঁক ভেজা কাপড় দিয়ে বন্ধ করুন, জানালার কাছে গিয়ে সাহায্যের সংকেত দিন এবং হোটেল কর্তৃপক্ষ বা দমকল বাহিনীকে দ্রুত অবহিত করুন।

এসব সতর্কতা কোনোভাবেই প্রশাসনের দায় কমায় না—হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব। কিন্তু যতদিন না সেই ব্যবস্থা নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে, ততদিন একজন সচেতন পর্যটকের সামান্য সতর্কতাই হয়তো জীবন বাঁচানোর শেষ অবলম্বন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভারতকে বাংলাদেশিদের জন্য ঢালাওভাবে ‘অনিরাপদ’ ঘোষণা করা হয়তো সমাধান নয়। কিন্তু অনিরাপদ হোটেল, ঘিঞ্জি ভবন আর দুর্বল জরুরি ব্যবস্থাপনায় যদি বারবার বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু ঘটতেই থাকে, তবে প্রশ্নটি থেকেই যাবে—ভারতে আমাদের জীবন কি সত্যিই নিরাপদ?

সম্পাদক, ডেল্টা টিভি
সাবেক ইমিগ্রেশন ভিসা টিম লিডার, আমেরিকান দূতাবাস ঢাকা