নেপালের বন্যার পানি গঙ্গায়, সতর্ক বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২:১৩ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২৬
নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পানি গঙ্গা অববাহিকায় প্রবাহিত হচ্ছে। এই পানির প্রভাব দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশেও আসতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা কম বলে মনে করছেন দেশের ভূ-তত্ত্ববিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে উজানের বৃষ্টি ও নদীর পানির স্তর নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
২৬ আগস্ট নেপালের রাসুয়া জেলায় আকস্মিক এই বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে এখন পর্যন্ত ৫৭৯ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ।
প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার পর ওই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও পাথর দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। ত্রিশূলী নদীর একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
এই ঢল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভোতেকোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদী অববাহিকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে। সেতু, সড়ক, বসতি ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভেসে গেছে। অনেক এলাকায় নদীর স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণকেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গঙ্গা হয়ে বাংলাদেশে আসতে পারে পানি
ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, এ ধরনের আকস্মিক বন্যাকে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা গ্লফ বলা হয়। হিমবাহ ধস কিংবা বরফ-পাথরে নদীর প্রবাহ আটকে যাওয়ার পর সেই বাধা ভেঙে গেলে অল্প সময়ে বিপুল জলরাশি নেমে এসে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
নেপালের ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর পানি পরে নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে। গণ্ডক নদী ভারতের বিহার দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গায় মিশবে। এরপর গঙ্গার প্রবাহের মাধ্যমে পানি ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে।
তবে নেপাল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানির গতি ও তীব্রতা অনেকটাই কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশে এর সরাসরি বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আপাতত কম।
উজানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন বলেন, নেপাল থেকে নেমে আসা পানি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময় এর তীব্রতা অনেকটা কমে যাওয়ার কথা।
তিনি নেপালের হিমবাহ হ্রদগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ভারত থেকে বন্যা ও নদীর পানির স্তরের তথ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেনও বাংলাদেশে সরাসরি বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন না। তাঁর মতে, উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানির গতি অনেক কমে যাবে।
তবে আগামী কয়েক দিনে উজানে ভারি বৃষ্টিপাত হলে দ্বিতীয় দফায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। এ জন্য ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশের গঙ্গা অববাহিকার বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানির স্তরের তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ব্যারাজ, তিস্তা ব্যারাজসহ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির স্তরের ওপর নজর রাখার কথা বলেছেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপির এক যৌথ গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলের তিব্বত, নেপাল ও ভারতের অববাহিকায় ৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদের ঝুঁকি বাড়ছে।
এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ মোকাবেলায় নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নেপালের এবারের বন্যায় বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বড় বিপদের আশঙ্কা কম হলেও ঘটনাটি হিমালয়-নির্ভর নদী অববাহিকার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি আবারও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের পরিস্থিতির দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পাওয়াই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য বন্যা মোকাবেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।



