বিদেশে নারী কর্মসংস্থান বাড়লেও নির্ভরতা সৌদি-জর্ডানে

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৮:৩৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নারী কর্মী যাওয়ার সংখ্যা আবার বাড়লেও তাদের কর্মসংস্থান এখনো মূলত সৌদি আরব ও জর্ডাননির্ভর। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ৪২ হাজারের বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এর ৯০ শতাংশের বেশি গেছেন এই দুই দেশে। গৃহকর্মের বাইরে নতুন খাতে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি না হওয়ায় বিদেশে নারী কর্মসংস্থানের বাজারে বৈচিত্র্য আসছে না।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১ লাখ ৫ হাজার নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬২ হাজারে-তিন বছরে প্রায় ৪১ শতাংশ কম। তবে চলতি বছর আগের বছরের তুলনায় নারী কর্মী যাওয়ার হার প্রায় ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

তবে বিদেশফেরত নারী কর্মীদের অভিজ্ঞতা বলছে, সংখ্যার এই বৃদ্ধি এখনো নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। দেশে ফিরে আসা অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, একাধিক বাড়িতে কাজ করানো, বেতন ও খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। অনেকে অসুস্থ হয়ে ফিরেছেন, আবার কেউ কেউ নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে নিজেদের খরচে দেশে ফিরেছেন।

মানিকগঞ্জের অঞ্জনা সৌদি আরবে গিয়ে মাত্র এক মাস টিকতে পেরেছেন। কাজের বদলে রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যালয়ে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। একই অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন নরসিংদীর সানজীদা আখতার। তাঁর অভিযোগ, ‘শুধু রুটি খেতে দেয়, ভাত ছাড়া থাকা যায় না।’

সৌদিতে সেফ হোম, নতুন বাজারে নজর

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেন, সৌদি আরবে সেফ হোম চালু রয়েছে এবং ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে নির্যাতনের ঘটনা কিছুটা কমেছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, নারী কর্মীদের জন্য জাপান ও হংকংয়ের মতো দক্ষ কর্মীর বাজারেও নজর দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে কেয়ারগিভার ও হাউসকিপিংয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ফিরে আসা নারী কর্মীদের সহায়তায় কাজ করছে ব্র্যাক, রামরু, ওকাপ ও নারী শ্রমিক কেন্দ্র। সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক নারী শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন। তাঁদের দীর্ঘ সময় কাজ করানো, কম বেতন দেওয়া ও অনিয়মিত খাবার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কেউ কেউ চরম মানসিক চাপে আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছেন।

৯৪ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার

ওকাপের এক গবেষণায় বিদেশফেরত নারী কর্মীদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ নারী বিদেশে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ৮২ শতাংশকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়েছে। ফলে নতুন করে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহও কমছে।

নারী কর্মীদের সুরক্ষায় নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রয়োজন হলে দেশগুলো শ্রমিক পাঠানো বন্ধও করেছে। বাংলাদেশ এখনো সে পর্যায়ে যেতে পারেনি।

ফলে বিদেশে নারী কর্মসংস্থান বাড়াতে শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় শ্রমবাজার তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে সাময়িকভাবে কর্মসংস্থান বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে এই বাজার আবার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।