পাকিস্তানের স্কলারশিপে ‘প্রতারণার’ অভিযোগ, বিপাকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬

বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত মেধাতালিকায় নাম দেখে নতুন অধ্যায় শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে তাঁদের কেউ কেউ দেখতে পান, শুরুতে যে ‘ফুললি ফান্ডেড’ বা সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তির কথা বলা হয়েছিল, চূড়ান্ত অফার লেটারে তার অনেক সুবিধার উল্লেখ নেই।

‘নলেজ করিডোর’ ও ‘আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপ’ নিয়ে এমন অভিযোগ সামনে আসার পর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বৃত্তির বিজ্ঞাপনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সম্পূর্ণ টিউশন ফি, মাসিক ভাতা, হোস্টেল চার্জ, বিমানের রিটার্ন টিকিট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার জন্য এককালীন ভাতার কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ব্যাচে নির্বাচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এসব সুবিধার সবগুলো না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।

একজন শিক্ষার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিজ্ঞাপনে ঘোষিত সুবিধার সাথে চূড়ান্ত অফার লেটারের মিল পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি, সেখানে শুধু শতভাগ টিউশন ফি ও আবাসন সুবিধার কথা বলা হয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, অফার লেটারে শুধু টিউশন ফি মওকুফের কথা ছিল। আবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়, যাতায়াত, ভিসা ফি, চিকিৎসা বিমা ও বিমান ভাড়ার খরচ নিজেদের বহন করতে হবে বলে তিনি জানতে পারেন।

এই শিক্ষার্থী বলেন, শুরু থেকেই যদি জানা থাকত যে শুধু টিউশন ফি দেওয়া হবে, তাহলে তাঁদের অনেকেই আবেদন করতেন না। সময়, অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে শেষ পর্যায়ে এসে এমন পরিস্থিতি জানায় তাঁরা হতাশ হয়েছেন।

৫০০ শিক্ষার্থীকে বৃত্তির ঘোষণা

পাকিস্তান-বাংলাদেশ ‘নলেজ করিডোর’ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫০০ শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ অর্থায়িত বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকায় সফরকালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন বলে পাকিস্তান হাইকমিশন জানিয়েছে।

প্রথম ব্যাচে ৭৪ জন শিক্ষার্থী পাকিস্তানে গিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। এবার দ্বিতীয় ব্যাচে স্নাতক পর্যায়ে ১২৫ জন, মাস্টার্সে ২২ জন এবং পিএইচডিতে ১৪ জন নির্বাচিত হয়েছেন। পাকিস্তান হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে তাঁদের নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার কথা।

এর আগে ১১ মে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে নির্বাচিত ৭৪ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিনা খরচে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি মাসিক ৪০ হাজার টাকা বৃত্তি পাচ্ছেন।

কী বলছে পাকিস্তান হাইকমিশন?

শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশন একটি বিবৃতি দিয়েছে।

তাদের বক্তব্য, আল্লামা ইকবাল বৃত্তিতে মাস্টার্স পর্যায়ে আর্থিক সুবিধা বণ্টনের পদ্ধতি স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে—এ বিষয়টি শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছে। তবে কর্মসূচির আওতায় যাওয়া সব যোগ্য শিক্ষার্থীকে সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে হাইকমিশন।

হাইকমিশন আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে শিক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ গভীর করার লক্ষ্যেই নলেজ করিডোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

তবে মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞাপনে ঘোষিত সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন কি না—এ বিষয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রশ্নের জবাব তখনও পাওয়া যায়নি।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে কোথায়?

এই ঘটনার পর মূল প্রশ্ন হচ্ছে—একটি বৃত্তিকে যখন ‘সম্পূর্ণ অর্থায়িত’ হিসেবে প্রচার করা হয়, তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে এর সুযোগ-সুবিধার ধরন কেন আলাদা হবে?

একজন শিক্ষার্থী শুধু একটি আবেদনপত্র জমা দেন না। এর সাথে তাঁর সময়, অর্থ, প্রস্তুতি, বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা জড়িয়ে থাকে। ফলে বৃত্তির শর্ত নিয়ে শুরু থেকেই স্পষ্ট তথ্য না থাকলে শেষ মুহূর্তে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার দায় কার—সেটি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

আমার দৃষ্টিতে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন অস্পষ্টতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। পাকিস্তান হাইকমিশন যদি বলে থাকে যে যোগ্য শিক্ষার্থীরা সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা পাবেন, তাহলে সেই সহায়তার পরিমাণ, ধরন এবং কোন কোন খরচ এর আওতায় পড়বে—তা লিখিতভাবে পরিষ্কার করা জরুরি।

বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

এই ঘটনায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচারিত একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তির শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা।

বিশেষ করে যে কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর প্রশংসা করা হয়েছিল, সেই কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা যখন শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তখন তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিক্ষার্থীরা যদি প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞাপনে ঘোষিত সুবিধা না পান, তাহলে কেন পাননি—তার ব্যাখ্যা পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চাওয়া দরকার। আবার যদি হাইকমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে সেটির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাও পৌঁছানো উচিত।

শিক্ষার্থীদের স্বার্থই হোক প্রথম বিবেচনা

একটি আন্তর্জাতিক বৃত্তির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। সেখানে বিজ্ঞাপন, নির্বাচন ও চূড়ান্ত অফার—প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।

‘নলেজ করিডোর’ ও ‘আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপ’ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের দ্রুত ও স্বচ্ছ সমাধান প্রয়োজন। বিশেষ করে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা যেন শেষ মুহূর্তে আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে তাঁদের উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য না হন, সেটি নিশ্চিত করা দরকার।

পাকিস্তান হাইকমিশন বলেছে, যোগ্য শিক্ষার্থীরা সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা পাবেন। এখন সেই সহায়তার বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ করা হলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট সবাই প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে পারবেন।

বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি হোক—এটাই প্রত্যাশা। একইসাথে আন্তর্জাতিক কোনো বৃত্তির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তব সুবিধার মধ্যে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

মনিরা নাজমী জাহান

পিএইচডি গবেষক, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য

ই-মেইল: moniranazmijahan@yahoo.com

সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম