চীনে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনে ‘নিষেধাজ্ঞা’, তথ্য দিলেই পুরস্কার

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

ডেল্টা আন্তর্জাতিক

প্রকাশিত: ১১:৫০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬

চীনে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের ওপর সরকারের নজরদারি ও চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব কর্মকাণ্ডের তথ্য দিতে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করছে স্থানীয় প্রশাসন। এমনকি তথ্যদাতাদের নগদ অর্থ পুরস্কারও দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গত ২ সেপ্টেম্বর তাইওয়ানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন চীনা আইনজীবী রুথ ওয়াং। তিনি চীনের অন্যতম পরিচিত ভূগর্ভস্থ প্রটেস্ট্যান্ট চার্চ ‘জায়ন চার্চ’-এর সদস্যদের পক্ষে আইনি লড়াই করছিলেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চপর্যায়ের মার্কিন কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় গত জুলাইয়ে জায়ন চার্চের প্রতিষ্ঠাতা যাজক এজর জিন মুক্তি পান। তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হওয়া আরও আটজন সদস্য এখনো চীনের বন্দিশালায় আটক রয়েছেন।

সংস্থাটির দাবি, ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সময় ‘ধর্মের চিনায়ন’ নীতি চালুর পর ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হয়েছে। এর আওতায় স্বাধীন ধর্মীয় অনুসারীদের পাশাপাশি তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবীরাও চাপের মুখে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের এক ডজনের বেশি শহরে ‘অবৈধ’ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের তথ্য পুলিশকে দিতে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ জন্য তথ্যদাতাদের নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইউনান প্রদেশের হংহে এলাকায় ৩৫ ধরনের আচরণকে ‘অবৈধ ধর্মীয় কর্মকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ব্যক্তিগত বাড়িতে ধর্মীয় সভার আয়োজন, উইচ্যাট বা সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে যাজকদের বক্তব্য দেওয়া, প্রকাশ্য স্থানে ধর্মীয় প্রচারপত্র বিতরণ এবং অনুমতি ছাড়া ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড রয়েছে।

একইভাবে কিংহাই প্রদেশের হাইদং অঞ্চলে হোটেল ও ভ্রমণ সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো ‘সন্দেহজনক’ কর্মকাণ্ডের তথ্য প্রশাসনকে জানাতেও তাদের বলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তথ্যদাতাদের পুরস্কৃত করার এই ব্যবস্থা বড় শহরগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। সিচুয়ান প্রদেশের চেংদুতে সরকারের বিবেচনায় ‘অবৈধ’ কোনো ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সঠিক তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ৮০০ রেনমিনবি বা প্রায় ১২০ মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ২০১৩ সালে শিনজিয়াং এবং ২০১৯ সালে গুয়াংডংয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া কঠোর ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এর ফলে খ্রিষ্টান, মুসলিম ও তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।

এদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া চীনের ‘পাবলিক সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন পানিশমেন্ট ল’-এর সংশোধনী নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধনীর মাধ্যমে ‘অবৈধ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে কোনো নাগরিককে পাঁচ থেকে ১৫ দিনের জন্য প্রশাসনিকভাবে আটকে রাখার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে এসব পদক্ষেপকে চীনে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর চলমান নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।