যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা: আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গড়তে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেবেন

ডেল্টা ডেস্ক

ডেল্টা ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩:১৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২৬

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবং বৈশ্বিক কর্মজগতে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচনের সময় থেকেই পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা, পেশাগত যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতিতেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচনে সতর্কতা

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং বা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতির ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। নিজের পছন্দের বিষয়ে কোর্সের মান, পাঠ্যক্রম, ব্যবহারিক কাজ, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সুযোগ বিবেচনা করতে হবে। একই বিষয়ের কোর্স হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে পাঠদানের পদ্ধতি, বিশেষায়ন ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকতে পারে।

ভর্তির আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে যোগ্যতা, টিউশন ফি, বৃত্তি ও কোর্সের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন, একাডেমিক সহায়তা ও ক্যারিয়ার পরামর্শের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। পাশাপাশি টিউশন ফির সঙ্গে আবাসন, খাবার, যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয় হিসাব করে বাস্তবসম্মত বাজেট তৈরি করা জরুরি। কোর্স ও বৃত্তির তথ্যের জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিলের স্টাডি ইউকে ওয়েবসাইট সহায়ক হতে পারে।

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, আইইএলটিএস পরীক্ষা ও পড়াশোনা শেষে ক্যারিয়ার গঠনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সহায়তা করছে ব্রিটিশ কাউন্সিল।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের ক্যাম্পেইন মার্কেটিং ম্যানেজার (এশিয়া প্যাসিফিক) মুতাম্মীম আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ইংরেজি ভাষার কোর্স, আইইএলটিএস প্রস্তুতি ও পরীক্ষা আয়োজন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কোর্স নির্বাচন, বৃত্তি এবং প্রি-ডিপার্চার গাইডেন্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে ব্রিটিশ কাউন্সিল।

তিনি আরও বলেন, অ্যালামনাই ইউকে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গ্র্যাজুয়েটরা পেশাগত যোগাযোগ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পান। এ ছাড়া স্টাডি ইউকে অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ডসের মাধ্যমে সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা গ্র্যাজুয়েটদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ ও অভিজ্ঞতা অর্জন

যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে কাজের অনুমতি শিক্ষার্থীর ভিসার শর্ত, কোর্সের ধরন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে। যোগ্য শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট শর্তে ক্লাস চলাকালে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। ছুটির সময়ে কাজের সুযোগও থাকতে পারে। তবে কাজ শুরু করার আগে নিজের ভিসার শর্ত যাচাই করা জরুরি।

খণ্ডকালীন কাজের মধ্যে দোকান, রেস্তোরাঁ, গ্রাহকসেবা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ থাকতে পারে। তবে চাকরি পাওয়া নিশ্চিত নয়। তাই পড়াশোনার সব খরচ খণ্ডকালীন কাজের আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা করা ঝুঁকিপূর্ণ।

ক্যারিয়ার গঠনের জন্য শুধু খণ্ডকালীন চাকরি নয়, নিজের পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্কিত ইন্টার্নশিপ, গবেষণা, স্বেচ্ছাসেবা ও দলগত প্রকল্পে অংশ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এসব অভিজ্ঞতা বাস্তব সমস্যা সমাধান, দলগতভাবে কাজ করা এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যারিয়ার পরামর্শ ও কর্মসংস্থান প্রস্তুতিমূলক সেবাও কাজে লাগানো উচিত।

ব্রিটিশ কাউন্সিলের হায়ার এডুকেশন প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সরকার আসিফ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক শিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নতুনভাবে চিন্তা করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং পেশাগত সম্ভাবনা তৈরির সুযোগ দেয়। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায়, ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন (টিএনই) পদ্ধতিতে বাংলাদেশে থেকেই কর্মজীবনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের নিজেদের লক্ষ্য, আর্থিক সামর্থ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী কোর্স বাছাই এবং ডিগ্রির স্বীকৃতি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন সরকার আসিফ ইকবাল। তাঁর মতে, যোগাযোগ, বিশ্লেষণী চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করার মানসিকতা ক্যারিয়ারে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি শুরু হোক পড়াশোনার সময় থেকেই

আন্তর্জাতিক কর্মজগতে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি যোগাযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ, সময় ব্যবস্থাপনা, সমস্যা সমাধান এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পড়াশোনার সময় বিভিন্ন প্রকল্প ও ব্যবহারিক কাজে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি নিজের অর্জন ও অভিজ্ঞতার নথি সংরক্ষণ করা উচিত। কোন প্রকল্পে কী দায়িত্ব পালন করেছেন, কী সমস্যা সমাধান করেছেন এবং তাতে নিজের অবদান কী ছিল—এসব তথ্য ভবিষ্যতে জীবনবৃত্তান্ত ও চাকরির সাক্ষাৎকারে কাজে আসতে পারে।

পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যে থাকতে বা কাজ করতে চাইলে তখনকার অভিবাসন নীতিমালা ও নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী ভিসার সুযোগ যাচাই করতে হবে। দেশে ফিরে কিংবা অন্য কোনো দেশে কাজ করার পরিকল্পনা থাকলেও ডিগ্রির স্বীকৃতি, পেশাভিত্তিক যোগ্যতা ও নিয়োগদাতাদের চাহিদা সম্পর্কে আগে থেকে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে শুধু ডিগ্রি অর্জনই সফলতার নিশ্চয়তা নয়। পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা, বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন এবং ধারাবাহিকভাবে পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমেই এসব সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব।