র্যাব বিলুপ্ত করে আসছে এসআরবি, খসড়া আইন প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২৬
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। খসড়া আইনের ওপর জনসাধারণের মতামতও আহ্বান করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জনমত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত নিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। পরে তা জাতীয় সংসদে পাস হলে নতুন আইন কার্যকর হবে। এর মাধ্যমে র্যাবের বিদ্যমান আইনি কাঠামো বিলুপ্ত হবে এবং র্যাবের সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়-দায়িত্ব, চলমান মামলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নতুন বাহিনী এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এর নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের যেকোনো স্থানে ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠন করা যাবে। বাহিনীর নিজস্ব লোগো, পতাকা ও নির্ধারিত পোশাকও থাকবে।
নতুন বাহিনীতে শুধু পুলিশ নয়, অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও সদস্যদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যাবে। প্রেষণের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, এসআরবির সদস্যরা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবেন। মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধে অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে তাদের। এছাড়া আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্তও করতে পারবে বাহিনীটি।
তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে। তদন্তের সব কার্যক্রম ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসারে পরিচালিত হবে।
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো অভিযোগ প্রতিকার কমিটি। অতীতে র্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধি, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি।
এই কমিটি নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত, প্রয়োজনে অনুসন্ধান দল গঠন এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে। বাহিনীর কার্যক্রমে অবৈধ প্রভাব, হয়রানি, অনিয়ম বা অন্যায় আচরণের অভিযোগও পর্যালোচনা করবে তারা।
খসড়া আইনে সদস্যদের জন্য বিস্তারিত শৃঙ্খলা ও আচরণবিধিও নির্ধারণ করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য, মাদকাসক্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন, বেআইনি অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্রের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা কিংবা জুয়া ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব গঠন করা হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল বাহিনীটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। গত দুই দশকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বাহিনীটি। সেই প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন নামে ও নতুন আইনি কাঠামোতে বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে খসড়া আইন অনুযায়ী, অভিযান পরিচালনা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও তদন্তের মতো মৌলিক ক্ষমতার বড় অংশই নতুন বাহিনীর ক্ষেত্রেও বহাল রাখা হয়েছে।



