শক্তিশালী সৌর দূরবীনে সূর্যের সবচেয়ে নিখুঁত ছবি, মিলল নতুন রহস্যের সন্ধান
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ৭:১২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৬, ২০২৬
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীন ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা সূর্যের পৃষ্ঠের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছেন। নতুন এসব পর্যবেক্ষণে প্রথমবারের মতো সূর্যের পৃষ্ঠে ঘূর্ণাবর্তের মতো সূক্ষ্ম কার্যকলাপ স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে, যা মহাকাশের আবহাওয়া (স্পেস ওয়েদার) সম্পর্কে নতুন ধারণা দিতে পারে।
বিজ্ঞানীরা জানান, সূর্যের অভ্যন্তরের অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাসের প্রবাহের কারণে এর চৌম্বক ক্ষেত্র ক্রমাগত মোচড় খায় ও ঘূর্ণায়মান থাকে। এই প্রক্রিয়াতেই বিপুল শক্তি সঞ্চিত হয় এবং পরবর্তীতে তা সৌর শিখা (Solar Flare) বা করোনাল মাস ইজেকশন (CME)-এর মতো শক্তিশালী বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ধরনের মহাকাশীয় ঘটনা পৃথিবীর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট, জিপিএস ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। একই সঙ্গে মহাকাশে অবস্থানরত নভোচারীদের জন্যও এটি ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সোলার অবজারভেটরির (এনএসও) বিজ্ঞানী ডেভিড ববোল্টজ বলেন, সূর্যই মহাকাশ আবহাওয়ার প্রধান উৎস। তাই সূর্যের কার্যকলাপ আরও ভালোভাবে বোঝা গেলে ভবিষ্যতে এসব ঘটনার আগাম পূর্বাভাস আরও নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, সূর্যের ক্ষুদ্রতম স্তরে কীভাবে শক্তির উৎপত্তি ও স্থানান্তর ঘটে, তা বোঝা মহাকাশ আবহাওয়া গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ।
এই গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সৌর দূরবীন ড্যানিয়েল কে. ইনোউয়ে সোলার টেলিস্কোপ। হাওয়াইয়ের একটি উঁচু পাহাড়ে স্থাপিত এই দূরবীন অত্যন্ত পরিষ্কার আকাশের সুবিধা নিয়ে সূর্যের পৃষ্ঠের অভূতপূর্ব সূক্ষ্ম ছবি ধারণ করতে সক্ষম।
এনএসওর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. ডেভিড কুরিডজে বিবিসিকে বলেন, এই ঘূর্ণায়মান গ্যাসের প্রবাহ চৌম্বকীয় শক্তি সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের সৌর বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা সূর্যের পৃষ্ঠে যে ঘটনাটি শনাক্ত করেছেন, তার নাম কেলভিন-হেলমহোল্টজ ইনস্ট্যাবিলিটি। এটি তখন ঘটে, যখন দুটি উত্তপ্ত গ্যাসের স্তর ভিন্ন গতিতে পাশাপাশি প্রবাহিত হয়। এর ফলে ছোট ছোট অস্থিরতা তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে ঘূর্ণাবর্তে রূপ নেয়। সমুদ্রে ছোট ঢেউ থেকে বড় তরঙ্গ তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
এনএসওর গবেষক ড. ফ্রেডরিখ ওয়েগার বলেন, এই আবিষ্কার শুধু মহাকাশ আবহাওয়ার উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, সূর্যের বাইরের স্তর কেন এত বেশি উত্তপ্ত থাকে— সেই দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক প্রশ্নেরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারে।
তার ভাষায়, সূর্যের ভেতরের শক্তি কীভাবে ওপরের স্তরে পৌঁছে যায়, এই গবেষণা সে বিষয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে। পর্যাপ্ত শক্তি জমা হলে তা হঠাৎ করেই সৌর শিখা বা করোনাল মাস ইজেকশনের মাধ্যমে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ডেভিড ববোল্টজ বলেন, মহাকাশের আবহাওয়া সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পেতে এবং এর প্রভাব থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখতে এ ধরনের গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সূর্য পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক অনেক তত্ত্ব যাচাইয়ের একটি অনন্য গবেষণাগার হিসেবেও কাজ করছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রথম পরীক্ষামূলক প্রমাণও সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল। তাই মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানবজাতির জ্ঞান বিস্তারে সূর্যবিষয়ক গবেষণা ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



