বিদেশে চাকরির প্রলোভন, সাইবার স্ক্যাম চক্রে আটকা বাংলাদেশিরা
ডেল্টা ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩:৫৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২৬
বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের মানব পাচারের ঘটনা দিন দিন নতুন ও আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। একদিকে ইউরোপে প্রবেশের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ ভূমধ্যসাগর পাড়ি, অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে জোরপূর্বক কাজ করানো—সব মিলিয়ে মানব পাচার এখন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য বলছে, মানব পাচারের ধরন বদলেছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’, যা অনলাইন প্রতারণা ও জোরপূর্বক সাইবার অপরাধে মানুষকে ব্যবহার করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে।
ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্স-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ইতালিতে ৪ হাজার ২৪৯ জন এবং গ্রিসে ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি পৌঁছেছেন।
তবে এই যাত্রাপথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লিবিয়ার বিভিন্ন আটককেন্দ্রে অসংখ্য বাংলাদেশি নির্যাতন, মুক্তিপণের দাবি এবং অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের মার্চে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন।
অন্যদিকে, মানব পাচারের নতুন রূপ হিসেবে সামনে এসেছে সাইবার স্ক্যাম চক্র। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস ও ভিয়েতনামে নিয়ে গিয়ে স্ক্যাম সেন্টারে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে।
ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরির প্রতিশ্রুতি পাওয়া ব্যক্তিদের ৯৮ শতাংশই প্রকৃত চাকরি পাননি। বরং ৯০ শতাংশকে বিভিন্ন অনলাইন জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কাজে বাধ্য করা হয়েছে। নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানালে অনেককে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন এমনকি বৈদ্যুতিক শকের মতো অমানবিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় গেছেন। তাদের অনেকেই বৈধ কর্মসংস্থান না পেয়ে স্ক্যাম সেন্টারে আটকা পড়েছেন। চলতি বছরের জুনে কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ৫৮৩ জন বাংলাদেশি উদ্ধার হয়ে দেশে ফেরেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, বিদেশে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়, ভিন্ন নামে পরিচয় ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় এবং নির্ধারিত প্রতারণার লক্ষ্য পূরণ না করলে মারধরসহ নানা ধরনের নির্যাতন করা হতো।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মানব পাচার আইনে ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা বিচারাধীন ও তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন এবং প্রায় ২ হাজার মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব পাচার এখন শুধু অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি।



