‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২৬

জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ভারত, চীন, আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থ ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, অন্য কোনো দেশের জনগণ বা সরকারের স্বার্থের আগে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়াই এ নীতির মূল বৈশিষ্ট্য।বাসসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ওই নীতিতে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থান এবং জনগণের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারও প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক বলয়ের দেশগুলোর সাথে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে বাংলাদেশ একা হয়ে যাওয়া নয়। জাতীয় স্বার্থের সাথে আপস না করে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা বাড়ানোই এ নীতির লক্ষ্য। ভারত, চীন, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের দেশগুলো, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় সরকার।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অর্থনৈতিক কূটনীতি

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন, প্রযুক্তির বিকাশ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বহুপক্ষীয় জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, কোনো উদ্যোগে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সেটি দেশের জন্য কী সুফল বয়ে আনবে, তা বিবেচনা করা হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ, ব্রিকস, সার্ক ও বিমসটেকের মতো বিভিন্ন কাঠামোয় অংশগ্রহণকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

‘বন্ধু চাই, প্রভু নয়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাহরাইনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পররাষ্ট্র সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তবে কোনো দেশের অধীনস্থ অবস্থান গ্রহণ করা যাবে না। তাঁর ভাষায়, ‘অন্য কোনো দেশ যত বড় বা শক্তিশালীই হোক না কেন, সেটি আমাদের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু প্রভু হতে পারে না।’

আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী অর্থনৈতিক কূটনীতি সম্প্রসারণ, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, কৃষিপণ্য, শাকসবজি ও মাছ রপ্তানির ক্ষেত্রেও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যে প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ শক্তি

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর।

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি হুমায়ুন কবিরের মতে, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যকর করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংহতি, সুশাসন এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতীয় প্রয়োজনের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থ সামলানোর কূটনৈতিক দক্ষতাও জরুরি।

তিনি বলেন, কোন দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী প্রত্যাশা করে, তা আবেগের পরিবর্তে বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

সার্ক পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ

আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করাকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার।

শামা ওবায়েদ জানান, সার্কের সদস্য দেশগুলোর সাথে এ সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার নীতি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সার্ক ও বিমসটেক—দুটি সংস্থাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা ভূরাজনৈতিক বলয়ের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।