গবেষণায় বড় কেলেঙ্কারি?
আন্তর্জাতিক জার্নালে ধাক্কা, বাংলাদেশিদের শতাধিক গবেষণা প্রত্যাহার
ডেল্টা আন্তর্জাতিক
প্রকাশিত: ১:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১, ২০২৬
গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি, ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (পিয়ার রিভিউ), তথ্য-উপাত্তের অসংগতি এবং অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে দেশের গবেষণার মান, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং উচ্চশিক্ষার সুনাম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকাশিত এসব প্রত্যাহারকৃত গবেষণাপত্রে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের নোটিশে ভুয়া পিয়ার রিভিউ, প্লেজিয়ারিজম (চৌর্যবৃত্তি), তথ্যের অসংগতি, একই তথ্য একাধিকবার ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতির মাধ্যমে সাইটেশন বাড়ানোর চেষ্টা এবং কিছু ক্ষেত্রে ‘পেপার মিল’-এর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের সংখ্যার দিক থেকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির নাম রয়েছে ৪৪টি গবেষণায়। এরপর রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (৪২), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (৩২), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (২১) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০)। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের নামও এই তালিকায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের ২৬টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন গবেষকের একাধিক গবেষণাপত্র বাতিল হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের কেউ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কেউ বলেছেন তাঁরা প্রকাশকদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন।
গবেষণা বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়া শুধু সংশ্লিষ্ট গবেষকের জন্য নয়, পুরো দেশের গবেষণা-ব্যবস্থার জন্যও নেতিবাচক বার্তা বহন করে। এতে আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্বনামধন্য জার্নালে গবেষণা প্রকাশের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিক্রিয়ায় দেখা গেছে, কোথাও তদন্ত শুরু হয়েছে, কোথাও গবেষকদের সতর্ক করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির পাওয়া যায়নি। কিছু প্রতিষ্ঠান অভিযোগ প্রমাণিত হলে গবেষকদের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনা ফেরত নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেছেন, কোনো শিক্ষক বা গবেষকের বিরুদ্ধে গবেষণা জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে তদন্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে ইউজিসি নিজেই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।
গবেষকদের মতে, গবেষণার গুণগত মান নিশ্চিত করতে শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা নয়, গবেষণা-নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণার সুনাম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



